নামাজের বিস্তারিত মাসয়ালা সমূহ ও নামাযের ফজিলত
মহান আল্লাহ পাকের নিকট নামায সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ্ পাকের নিকট নামায অপেক্ষা প্রিয় ইবাদত আর কিছু নাই। আল্লাহ্ পাক মানুষের উপর দিনরাত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করে দিয়েছেন। যারা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায আদায় করে তারা পরকালে বেহেশতের উত্তম স্থানে অবস্থান করিবে। এবং যাহারা নামায পড়েনা তাহারা জাহান্নামের নিকৃষ্টতম স্থানে অবস্থান করিবে।
হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ভালভাবে ওযু করে ভয় ও ভক্তি সহকারে রীতিমত নামায আদায় করে কিয়ামতের দিন আললাহ্ পাক তাহার সগীরা গুনাহ্ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং বেহেশতের উত্তম জায়গায় স্থান দিবেন।
আর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “নামায ইসলামের খুঁটি স্বরূপ”। অর্থাৎ ঘর যেমন খুটি ছাড়া তৈরী হয় না বা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। ঠিক তেমনি ইসলামরূপ ঘর ও নামায নামক খুঁটি ছাড়া টিকতে পারেনা। যে ঠিকমত নামায কায়েম করল সে ইসলামকে জারী রাখতে সাহায্য করল। আর যে নামায কায়েম করল না সে যেন ইসলামকে ধ্বংস করে দিল।
কিয়ামতের দিন সর্ব প্রথম নামাযের হিসাব নেওয়া হবে। নামাযী ব্যক্তির হাত, পা, মুখমন্ডল কেয়ামতের দিন সূর্যের আলোর মত উজ্জল হবে। কিন্তু বেনামাযীর এর উল্টা ফল হবে এবং জাহান্নামী হবে। হাদীসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের ময়দানে নামাযীগণ নবী, শহীদ ও অলীগণেরর সঙ্গে থাকিবে। এবং বেনামাযীরা, ফেরাউন, সাদ্দাদ, হামান, কারূনের এবং আরও বড় বড় কাফেরদের সাথে থাকবে।
প্রত্যেক ব্যক্তির নামায পড়া একান্ত প্রয়োজন। নামায না পড়িলে আখেরাতে এবং দুনিয়ায় প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হইতে হইবে। নামায কাহারও জন্য মাফ নাই। কোন অবস্থায়ই নামায বাদ দেয়া জায়েয নাই, রুগ্ন, খোড়া, বধির, অন্ধ, আতুর, বোবা যে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই নামায আদায় করতে হবে।
আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে বলেছেন -
قَدْ اَلفْلَحَ الْمُؤْ مِنُوْنَ الَّذِيْنَ هُمْ صَلَوتِهِمْ خَاشِعُوْنَ
উচ্চারণ-ক্বাদ আফলাহাল মুমিনুনাল লাজিনাহুম ছালাতিহিম খাশিউন।
হযরত আদম (আঃ) হইতে আরম্ভ করিয়া শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত দুনিয়াতে যত নবী রাসুল আসিয়াছেন তাঁহাদের প্রত্যেকের উপর এবং তাঁহাদের উম্মতদের উপর নামায পড়া ফরয ছিল। কোন নবীর প্রতি ১০ ওয়াক্ত, কারও প্রতি ৩০ ওয়াক্ত, কারও প্রতি ৫০ ওয়াক্ত, কারও প্রতি ৪০ ওয়াক্ত নামায ফরয ছিল। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যখন মেরাজে গমন করেন, তখন আললাহ্ পাক ৫০ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছিলেন এবং পর্যায়ক্রমে কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। কিন্তু আখেরী জামানার উম্মতগণ ৫ ওয়াক্ত নামায পড়িলেই ৫০ ওয়াক্ত নামাযের সওয়াব পাইবে। নামায আললাহ্ পাকের একটি উপহার। যাহারা আললাহ্ পাকের দেয়া এই উপহার অবহেলা করবে বা অবজ্ঞা প্রকাশ করবে তাহারা কখনই আললাহ্ পাকের প্রিয় বান্দা হইতে পারবেনা।
আল্লাহ্ পাক নামাযের ফজিলত সম্মন্ধে কোরআন পাকে বলেছেন —-
وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلَى صَلَوتِهِمِِ يُحَا فِظُوْنَ اُولَئِكَفِىْ جَنَّتِمُّكْرَمُوْنَا
উচ্চারনঃ ওয়াল্লাজিনা হুম আলা ছালাওয়াতিহিম ইউহাফিজুনা উলাইকা ফি জান্নাতিম মুকরামুন।
অনুবাদ ঃ যে সমস্ত লোক যত্ন সহকারে নামায আদায় করবে তাহারাই বেহেশতে যাইবে এবং অশেষ সম্মানের অধিকারী হইবে।
নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায যেমন তোমাদের বাড়ীর সামনে দিয়া প্রবাহিত একটি নদীর মত। তোমরা যদি প্রতিদিন ৫ বার ঐ নদীতে গোসল কর, তবে যেমন তোমাদের শরীরে কোন ময়লা-আবর্জনা থাকতে পারেনা, তেমনি যে ব্যক্তি পাঁচ বার নামায পড়ে কোন প্রকার পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারেনা। নবী পাক (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, যখন কোন ব্যক্তি ভক্তি সহকারে অজু করে, ভয় মিশ্রিত ভাবে নামায পড়ে, আল্লাহ্ পাক তাহার জন্য দোযখের আগুন হারাম করে দেন। কিয়ামতের দিন নামাযই ঐ ব্যক্তিকে দোযখের আগুন হইতে বাঁচাইয়া বেহেশতে নিয়া যাইবে। নামায পড়ার সময় যদি কপালে ধুলা মাটি ভরিয়া যায় তবে তাহা পরিস্কার করবেনা। কারণ যতক্ষন না মাটি কপালে থাকে ততক্ষণ আললাহ পাকের রহমত বর্ষিত হইতে থাকে।
হযরত আদম (আঃ) এর উপর ফজরের নামায, হযরত দাউদ (আঃ) এর উপর জোহরের নামায, হযরত সোলায়মান (আঃ) এর উপর আছরের নামায, হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর উপর মাগরিবের নামায, এবং হযরত ইউনুছ (আঃ) এর উপর এশার নামায ফরয করা হয়েছিল। যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঠিকমত ভক্তি সহকারে আদায় করবে, সে উপরের পাঁচজন নবী রাসূলের সমান সওয়াব পাইবে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আমার সাথে আলাপ করছিলেন। এমন সময় নামাযের ওয়াক্ত হইল। তিনি তখনই উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার শরীরের রং এবং চেহারা পরিবর্তন হইয়া গেল। তাঁহার ভাব দেখিয়া আমার মনে হইতেছিল তিনি আমাকে চিনিতে পারিতেছেন না। আমি নবী পাক (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে ইহার কারণ জিজ্ঞাস করলে তিনি বলিলেন, হে আয়েশা! ইহা আললাহ পাকের আদেশ প্রতি পালনের সময়। এসময়ে প্রত্যেকের এই আহবানে ভয় হওয়া উচিত।
নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন কোন বান্দা অযু করিয়া জায়নামাযে দাঁড়ায়, তখন আল্লাহ পাক একজন ফেররেশতাকে পাঠাইয়া তাকে বলিয়া দেন যে, আমার অমুক বান্দা নামায পড়িবার জন্য প্রস্তুত হইতেছে, কিন্তু তাহার শরীরের পূর্বের পাপরাশি সঞ্চিত আছে। নাপাক জিনিস সাথে করে নামায পড়িলে তাহার নামায শুদ্ধ হইবে না। তুমি উহার শরীর হইতে সমস্ত পাপ তোমার মাথায় লইয়া দাঁড়াইয়া থাক। আর আমার বান্দা নিস্পাপ অবস্থায় নামায আদায় করুক। আল্লাহ্ পাকের আদেশ অনুযায়ী উক্ত ফেরেশতা তাহার সমস্ত পাপ উঠাইয়া নিজের মাথায় লইয়া দাঁড়াইয়া থাকে। তারপর নামায পড়া শেষ হইলে ফেরেশতা বলে হে আল্লাহ্! আপনার বান্দার নামায পড়া শেষ হয়েছে। তাহার পাপগুলি এখন তাহার শরীরে ছাড়িয়া দেই। আল্লাহ পাক বলেন, আমার নাম ‘রাহমানুর রাহিম’ আমি বান্দার শরীর হইতে পাপের বোঝা নামাইয়া আবার যদি সেই বোঝা তাহাকে চাপাইয়া দেই তবে আমার রাহমান নামের স্বার্থকতা থাকেনা। হে ফেরেশ্তা! আমার এ বান্দার পাপের বোঝা দোযখে নিক্ষেপ করিয়া জ্বালাইয়া দাও। এখন হইতে আমার এই বান্দা নিস্পাপ।
একদিন নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণের সহিত বসিয়া আছেন। এমন সময় একন ইহুদী আসিয়া বলিল, হে মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ! আপনাকে আমি একটি প্রশ্ন করব। আপনি যদি তাহার উত্তর দিতে পারেন তবেই বুঝিব যে আপনি সত্যিই আল্লাহ্র নবী। কেননা কোন নবী ব্যতীত আমার এই প্রশ্নের উত্তর কেহই দিতে পারবে না। তখন নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিলেন তোমার প্রশ্ন কি? ইহুদী বলিল, আপনার ও আপনার উম্মতের উপর যে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায নির্দিষ্ট করা হয়েছে ইহার তত্ত্ব কি? নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বললেন, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশের দিকে চলিয়া যায় তখন প্রথম আসমানে একদল ফেরেশতা আল্লাহপাকের ইবাদতে লিপ্ত হয়। ঐ সময় সমস্ত আসমানের দরজা খোলা থাকে। মানুষ ও সমস্ত ফেরেশতাদের ইবাদত আল্লাহ্ পাকের দরবারে পোঁছায়া যায়। জোহরের সময়ে আল্লাহ্র নিকট সকল ইবাদত কবুল হয়। আসরের ওয়াক্ত শয়তান ধোকা দিয়া আদম (আঃ) কে আল্লাহ্ পাকের নাফরমানি করাইয়াছিল। ঐ সময়ে নামাযের আদেশ হওয়ার উদ্দেশ্য হইল, উক্ত সময়ে নামায পড়লে শয়তান কোন প্রকারে ধোকা দিতে পারবেনা। মাগরিবের ওয়াক্তে হযরত আদম (আঃ) এর তওবা কবুল হইয়াছিল। উক্ত সময়ে নামায পড়িয়া আল্লাহ পাকের নিকট যে দোয়া করিবে আল্লাহ পাক তাহা কবুল করিবেন। এশা ওয়াক্ত এমনি সময় যখন আমার পূর্ববর্তী সমস্ত নবীগণের ও তাঁহাদের উম্মত গণের উপর এশার নামায ফরয ছিল। এই নামায পড়িলে সমস্ত পয়গাম্বরের উপর নির্দিষ্ট নামাযের ছওয়াব পাওয়া যায়। আর ফজরের ওয়াক্তের মর্ম এই যে, যখন সূর্য উদিত হয় তখন উহা শয়তানের মাথার উপর দিয়া উদিত হয়। সেই সময় কাফের মোশরেকগণ তাহাদের দেব দেবীদের উদ্দেশ্য করে শয়তানকে সিজদা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক আমাকে এবং আমার উম্মতগণকে উহার পূর্বেই নামায পড়িতে আদেশ করেছেন। এই কথা শুনিয়া ইহুদী বলিল, আমি বুঝিলাম আপনি সত্যই আল্লাহ্ নবী। তারপর সেই ইহুদী তার দলবল লইয়া মুসলমান হইয়া গেল।
নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তুমি যখন নামাযে দাঁড়াইবে তখন মনে মনে এইরূপ ধারনা করিবে যে আমি আল্লাহ পাকের সামনে দাঁড়াইয়াছি। যদিও আমি তাঁহাকে দেখিতেছিনা কিন্তু তিনি আমাকে দেখিতেছেন।
এক যুদ্ধে হযরত আলী (রাঃ) এর পায়ে তীর বিদ্ধ হইয়াছিল। তিনি তীরের আঘাতের যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া পড়িলেন। অনেক চেষ্টা করিয়াও তীর বাহির করতে পারছেন না। নামাযের সময় হযরত আলী (রাঃ) নামাযের নিয়ত করলে নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর ইশারায় কয়েক জন ছাহাবা সজোরে টানিয়া তীরটি বাহির করিয়া ফেলিলেন। রক্তে জায়নামায ভিজিয়া গেল। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) ইহার কিছুই টের পেলেন না। নামায শেষে জায়নামাযে রক্ত দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন ইহা কিসের রক্ত।
আল্লাহ্ পাকের নিকটতম বান্দাগণের নামায সাধারণতঃ এই রকমই হয়ে থাকে। নামাযের ফজিলত বলে শেষ করা যাবে না। তাই মুসলমান ভাইদেরকে সাবধান করে দিতেছি নামায ছাড়া পরকালে পার পাওয়া যাবেনা।
নামায না পড়ার শাস্তি
আল্লাহ পাক তাঁর কোরআন পাকে ঘোষনা করেছেন-
فَوَيْلُ لِّلْمُصَلِّيْنَ الَّذِيْنَ هُمْ عَنْ صَلَوتِهِمْ سَا هُوْنَ
উচ্চারন ঃ ফাওয়াইলুলি্লল মুছালি্লনাল্লাজিনাহুম আনছালাতিহিম ছাহুন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন -জাহান্নাম নামক দোযখে বিরাট একটি গর্ত আছে তাহার নাম অয়েল। এই জায়গা এতই কঠিন আজাবে পরিপূর্ণ যে, অন্যান্য দোযখীগণ প্রত্যেক দিন সত্তর বার আল্লাহ পাকের নিকট আরজ করবে, হে আল্লাহ্ তাবারুক তায়ালা! তুমি আমাদিগকে ঐ অয়েল দোযখ হইতে রক্ষা করিও।
যাহারা নামায পড়িতে আলস্য করে সময়মত নামায পড়েনা, মাঝে মাঝে পড়ে এইরূপ ব্যক্তিদের কেমন শাস্তি্ত হইতে পারে।
হাদীসে উল্লেখ আছে, প্রতি ওয়াক্ত নামায ছাড়িয়া দেয়ার জন্য আশি ছোকবা দোযখে থাকতে হবে। দুনিয়ার আশি বৎসর সমান এক ছোকবা হয়। তাহার আশি ছোকবা অর্থৎ ১৬০০ (এক হাজার ছয়শত) বৎসর এক ওয়াক্ত নামায কাযা করলে দোযখে থাকতে হবে। যাহারা মোটেই নামায পড়েনা এবং নামাযের প্রতি মিশ্বাসও রাখেনা তাদের অনন্তকাল দোযখে থাকতে হবে।
নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মুসলমান এবং কাফেরের মধ্যে পাথক্য এই, মুসলমান নামায পড়ে আর কাফের নামায পড়ে না। কাজেই বেনামাযী কাফেরের মধ্যে গণ্য হয়ে যায়। যদি কেহ বলে কিসের নামায, নামায পড়িয়া কি হইবে, সাথে সাথে সে কাফের হইয়া যাইবে। অনেক লোক বলে আমরা গরীব মানুষ রুজী রোজগার করতে হয়। নামায পড়ার সময় কোথায়? তাহারা চিন্তা করেনা দুনিয়ার সুখ শান্তি ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাতের শান্তি অনন্তকাল। যাহারা অনন্তকালের সুখ শান্তি নষ্ট করে দুনিয়ায় দুদিনের শান্তির আশায় থাকে তাহাদের মত আহাম্মক আর নাই। রুজি রোজগার দেয়ার মালিক আল্লাহ পাক। তিনি যদি অনুগ্রহ করে রুজি না দেন তবে সারা জনম পরিশ্রম করে রুজি পাওয়া যাবে না। আর যদি আল্লাহ পাক দয়া করে দেন তবে মুহুর্তের মধ্যে তাহাকে সম্পদশালী করিয়া দিতে পারেন। কাজেই রুজির আসায় নামায পরিত্যাগ করা উচিৎ নয়।
অনেক মেয়ে লোক বলে, ছেলে-মেয়ে নিয়া সংসারের নানা কাজকর্ম করিয়া নামায পড়ার সময় থাকেনা। আবার বলে আমার নামায পড়ার মত কাপড় চোপর নাই। একখানা মাত্র কাপড় তাও আবার ঠিকমত পাক পবিত্র করতে পারিনা। নামায পড়ব কেমনে? এই সমস্ত বাজে অজুহাতের কোন মূল্য নাই আল্লাহ্ পাকের দরবারে। যাহাদের নামায পড়ার আগ্রহ আছে তারা নানা বাধা বিপত্তির মধ্যেও নামায পড়তে সক্ষম হয়। আর যাহারা নামায পড়বেনা তাহাদের ওজর আপত্তির সীমা নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ পাক যখন নিজে কাজীর আসনে বসবেন। তখন এই সমস্ত ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবেনা।
যারা নামায পড়েনা তাদের জন্য আল্লাহ্ পাক পনেরটি আজাব নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন। পনেরটি আজাবের মধ্যে ছয়টি দুনিয়ায়, তিনটি মৃতু্য সময়, তিনটি কবরের মধ্যে, তিনটি হাশরের মধ্যে দেয়া হইবে।
দুনিয়াতে ছয়টি আযাব ১। তাহার জীবনে কোনরূপ বরকত হইবেনা । ২। আল্লাহ্ তার চেহারা হইতে নেক লোকের চিহ্ন উঠাইয়া লইবেন। ৩ । যে যাহা কিছু নেক কাজ করবে, তাহার ছওয়াব পাইবেনা। ৪। তাহার দোয়া আল্লাহ্ পাকের নিকট কবুল হইবে না। ৫। আল্লাহ্ পাকের সমস্ত ফেরেশতা তাহার উপর অসন্তুষ্ট থাকবে। ৬। ইসলামের মূল্যবান নেয়ামত সমূহ হইতে বঞ্চিত করা হইবে।
মৃতু্যর সময় আজাব তিনটিঃ ১। অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হইয়া মৃতু্যবরণ করিবে। ২। ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃতু্য বরন করিবে। ৩।
মৃতু্যকালে তাহার এত পিপাসা পাইবে যে, তাহার ইচ্ছা হইবে দুনিয়ার সমস্ত পানি পান করিয়া ফেলিতে।
কবরের মধ্যে তিনটি আজাব ঃ ১। তাহার কবর এমন সংকীর্ণ হবে যে তাহার এক পাশের হাড় অপর পাশের হাড়ের সংগে মিলিত হইয়া চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যাইবে। ২। তাহার কবরে, দিনরাত্রি সবসময় আগুন জ্বালাইয়া রাখা হবে। ৩। আল্লাহ্ তাহার কবরে একজন আজাবের ফেরেশ্তা নিযুক্ত করিবেন। তাহার হাতে লোহার মুগুর থাকবে। সে মৃত ব্যক্তিকে বলতে থাকবে যে, দুনিয়ায় কেন নামায পড় নাই। আজ তাহার ফল ভোগ কর। এই বলিয়া ফজর নামায না পড়ার জন্য ফজর হইতে জোহর পর্যন্ত, জোহর নামাযের জন্য জোহর থেকে আছর পর্যন্ত, আছরের নামাযের জন্য আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, মাগরিবের নামাযের জন্য মাগরিব হইতে এশা পর্যন্ত এবং এশার নামাযের জন্য এশা হইতে ফজর পর্যন্ত লোহার মুগুর দ্বারা আঘাত করতে থাকবে। প্রত্যেক বার আঘাতের সময় বজ্রপাতের মত শব্দ হইবে এবং শরীর চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া পঞ্চাশ গজ মাটির নিচে চলিয়া যাইবে। সেই ফেরেশ্তা পুনরায় তাহাকে জীবিত করিয়া হাড় মাংস এক করিয়া আবার আঘাত করিতে থাকিবে। এই ভাবে কিয়ামত পর্যন্ত লোহার মুগুর দিয়া তাহাকে আঘাত করতে থাকবে।
হাশরের মাঠে তিনটি আজাব ঃ ১। একজন ফেরেশতা তাকে পা উপরের দিকে এবং মাথা নিচের দিকে অবস্থায় হাশরের মাঠে লইয়া যাইবে। আল্লাহ পাক তাহাকে অনুগ্রহের দৃষ্টিতে দেখবেন না। সে চির কালের জন্য দোযখী হইয়া নিজের কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে থাকবে।
নবী করিম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে আট শ্রেণীর লোকের উপর কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক অসন্তুষ্ট থাকবেন। তাহাদের মুখের আকৃতি অত্যন্ত কুশ্রী ও ভীষণাকার হইবে। হাশরের মাঠে প্রত্যেক ব্যক্তি তাহাদিগকে দেখিয়া ঘৃণা করিবে। এই কথা শুনার পরে সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে সমস্ত লোক কাহারা? নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বললেন —১। জ্বেনা-কার ২) অবি-চারক বাদশাহ্ বা হাকিম। ৩। মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান। ৪। সুদখোর ৫। পর-নিন্দাকারী ৬। অন্যায়কারী এবং অত্যাচারী ৭। মিথ্যা সাক্ষীদাতা। ৮ বে-নামাযী। ইহাদের মধ্যে বে-নামাযীর শাস্তিই বেশী হইবে। বে-নামাযীকে আগুনের পোশাক পড়াইয়া শিকলে বাঁধিয়া আগুনের কোড়া মারতে থাকবে। বেহেশত তাহাকে বলতে থাকবে তুমি আমার দিকে অগ্রসর হইওনা। দোযখ তাহাকে বলবে আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। তোমার দ্বারা আমার পেটের ক্ষুধা নিবারণ করব। এই বলিয়া দোযখ তাহার জিহ্বা বাড়াইয়া ভিতরে নিয়া যাইবে।
নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, জাহান্নাম দোযখের মধ্যে লমলম নামে একটি কুপ আছে। উহা অসংখ্য সাপ বিচ্ছুতে ভর্তি। প্রত্যেকটা সাপ একটি পাড়ের সমতুল্য এবং একটা বিচ্ছু হাতির সমতুল্য হইবে। সেই সমস্ত সাপ বিচ্ছু সব সময় বে-নামাযীকে কামড়াইতে থাকিবে, একবার কামরাইলে সত্তর বৎসর পর্যন্ত তাহার যন্ত্রনা থাকিবে এবং কাহারও মৃতু্য হইবে না।
নামাযের ফরয সমূহ
নামায আদায় করিতে হইলে কতকগুলি নিয়ম অবশ্যই পালন করিতে হইবে । নামাজের বাহিরে আটটি নিয়ম । ইহাকে নামাজের শর্ত বলে এবং নামাজের ভিতরে ছয়টি ফরয । ইহাকে রোকন বলে ।
নামাযের শর্তসমূহ
নামাজ আরম্ভ করিবার পূর্বে যে সমস্ত কাজ অবশ্য কর্তব্য, তাহাকে নামাযের শর্ত বলে । ইহা আটটি; যথা :-
১) শরীর পাক-পবিত্র করিয়া লওয়া, অর্থাৎ অযু কিংবা গোসলের প্রয়োজন হইলে তাহা আদায় করিয়া লইতে হইবে ।
২) পোষাক পাক হওয়া । যদি কাপড়ে কোন নাপাক বস্তু নাগিয়া থাকে তাহা ধুইয়া পাক করিয়া লইবে অথবা উহা পরিবর্তন করিয়া পাক-পবিত্র কাপড় পরিধান করিয়া লইতে হইবে ।
৩) স্থান পাক হওয়া -অর্থাৎ যে স্থানে দাঁড়াইয়া নামায পড়িবে, তাহা পাবিত্র হওয়া ।
৪) ছতর ঢাকিয়া লওয়া – অর্থাৎ নামায পড়িবার সময়ে পুরুষের নাভী হইতে ও স্ত্রীলোক হইলে মুখ, হাতের কব্জা ও পায়ের তলা ব্যতীত সমুদয় শরীর ঢাকিয়া লওয়া কিন্তু বাদী হইলে পেট, পিঠ, পার্শ্ব ও নাভী হইতে জানুর নীচ পযন্ত কাপড় দ্বারা ঢাকিয়া লওয়া ফরয ।
৫) কাবা শরীফের দিক মুখ করিয়া দাঁড়ান ।
৬) নির্দিষ্ট ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা । নিয়ত করা-যে ওয়াক্তের নামায পড়িবে, তাহার নিয়ত করা ।
৭) তাকবীরে তাহরীমা বলা । অর্থৎ নামাজের নিয়ত করিয়া “আল্লাহু আকবার” বলিয়া নামায আরম্ভ করা ।
নামাযের রোকনসমূহ
নামায আরম্ভ করিবার পর হতে যে সকল কাজ করা ফরয, তাহাকে নামাযের রোকন বলে । ইহা মাত্র ছয়টি; যথা :-
১) দাঁড়াইয়া নামায আদায় করা ।
২) নামাযের মধ্যে কোরান পাকের কিছু আয়াত পাঠ করা ।
৩) রুকু করা ।
৪) সিজদা করা ।
৫) শেষবারে তাশাহুদ পাঠ করা ।
৬) ইচ্ছা পর্বক কোন কাজ করিয়া নামায ভঙ্গ করিয়া লওয়া ।
ছালামের সহিত নামায ভঙ্গ করা সুন্নত । নামায আদায় করিতে গিয়া উপরোক্ত ১৪টি ফরযের কোন একেটি ভুলেও ছাড়িয়া দিলে নামায শুদ্ধ হবে না; নামায পুণরায় পড়িতে হইবে ।
নামাযের ওয়াজিব সমূহ
নামাযের মধ্যে যে সকল ওয়াজিব আছে, ইহা থেকে কোন একটিও ভুল বশতঃ ছাড়িয়া দিলে শেষ বৈঠকে ছিজদায়ে সাহু দিতে হবে ।
১) প্রত্যেক রাকাতে প্রথম সূরাহ ফাতিহা পাঠ করা ।
২) সূরাহ্ ফাতিহার পর অন্য একটি সূরাহ মিলাইয়া পড়া (বড় এক আয়াত বা ছোট তিনি আয়াত)
৩) পরপর নামাযের রোকন গুলি সম্পন্ন করা অর্থাৎ প্রত্যেক রুকু সিজদা করা এবং তার-তিবের প্রতি লক্ষ্য রাখা ।
৪) প্রথম বৈঠক ।
৫) আত্তাহিয়্যাতু পড়া ।
৬) নামাযান্তে ছালাম ফিরান ।
৭) দুই ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর বলা ।
৮) ফরয নামাযের প্রথম দুই রাকআতে, ছুন্নত ও নফল নামাযে সকল রাকআআতে সূরা ফাতিহার সহিত অন্য একটি সূরা পড়া ।
৯) নামাযের রোকনগুলি আস্তে আস্তে আদায় করা ।
১০) যে নামায উচ্চঃস্বরে পড়িতে হয়, তাহা উচ্চঃস্বরে পড়া এবং যাহা আস্তে আস্তে পড়িতে হয় তাহা আস্তে আস্তে পড়া ।
নামাযের সুন্নত সমূহ
১)তাকবীর বলিয়া দুই হাত কর্ণের লতি পর্যন্ত উঠান ।
২) হাতের আঙ্গুল পরস্পর পৃথক রাখা ।
৩) ইমামের জন্য নামায আরম্ভের তাকবীর উচ্চঃস্বরে পড়া ।
৪) ছানা পাঠ করা ।
৫) “আউযুবিল্লাহ্” পাঠ করা ।
৬) “বিছমিল্লাহ্” পাঠ করা ।
৭) সূরা ফাতিহা পাঠ করিবার পর ঈমাম ও মুস্তাদিগণের মৃদুস্বরে “আমীন” বলা ।
৮) পুযরুষের জন্য নাভীর নীচে তাহরিমা বাঁধা আর স্ত্রী লোকের জন্য ছিনার উপরে তাহরিমা বাঁধা
৯) রুকুর তাকবীর বলা ।
১০) রুকুতে দুই জানু ধরা ও আঙ্গুল সমুহ পরস্পর পৃথক রাখা ।
১১) রুকুর ভিতরে তিন, পাঁচ বা সাতবার তাছবীহ্ বলা ।
১২) রুকু হইতে উঠিয়া সোজা হইয়া দাঁড়ান ।
১৩) রুকু হইতে উঠিবার সময়ে ইমামের “ছামিয়াল্লাহ হুলিমান হামীদা” ও মোক্তাদিগণের “রাব্বানা লাকাল হামদ” বলা ।
১৪) ছেজদায় যাইয়া দুই হাঁটু ও তাকবীর বলিয়া বসা ।
১৫) ছেজদায় তাছবীহ্ পড়া ।
১৬) পুরুষের জন্য ছেজদাহ হইতে উঠিয়া ডান পা খাড়া রাখিয়া বাম পায়ের উপর বসা, আর স্ত্রীলোকের উভয় পা ডান দিকে বাহির করিয়া ছতরের উপর বসা ।
১৭) ছেজদা থেকে উঠিয়া এক তছবীহ্ পরিমাণ সময় বসিয়া থাকা ।
১৮) দরুদ শরীফ পাঠ করা ।
১৯) দোয়ায়ে মাছুরা পড়া ।
২০) দুই দিকে ছালাম ফিরান ।
নামাযের মোস্তাহাব সমূহ
এক্বামতের সময়ে “হাইয়্যালাল ফালাহ্” বলামাত্র নামাযে ঠিকভাবে দাঁড়ান ।
তাকবীরে তাহরীমা বলার সময়ে আন্তিন হইতে হাতের তালু বাহির করা ।
দাঁড়াইবার সময়ে সিজদার জায়গার প্রতি দৃষ্টি রাখা ।
রুকুতে পায়ের পাতার দিকে দৃষ্টি রাখা ।
বৈঠকে কোলের দিকে দৃষ্টি রাখা ।
সাধ্যানুযায়ী হাসি ও কশি বন্দ রাখা ।
রুকুতে মাথা ও পৃষ্ঠ ভাগ সমান উঁচু রাখা ।
সিজদায় প্রথমে দুই জানু ও দুই হাত জমিনে রাখা, পররে নাক ও তারপরে কপাল জমিনে রাখ এবং সেজদা হইতে উঠিবার সময়ে যথাক্রমে প্রথমে কপাল, পরে নাক উঠাইয়া তৎপর দুই হাত জানুর উপরে রাখিয়া বসা ।
দুই হাতের মধ্যে মস্তক রাখা, নাক দুই বুদ্ধাংগুলির মধ্যে বরাবর রাখা ।
হাত-পায়ের আঙ্গুলিসমূহ কেবলা মোখ রাখা ।
ছালাম ফিরাইতে দুই স্কন্ধের প্রতি দৃষ্টি রাখা ।
সেজদায় পুরুষের পক্ষে দুই বাজু প্রথক ভাবে রাখা ও এইরূপ ভাবে উঁচুতে রাখিতে হইবে । যেন বকরীর বাচ্চা যাতায়াত করিতে পারে । কিন্তু স্ত্রীলোকের পক্ষে সেজদায় ইহার বিপরীত করিতে হইবে । যেমন দুই বাজু চাপিয়া রাখা এবং রানের উপর পেট রাখা ।
তিন বারের অধিক-বেজোড় তছবীহ্ পড়া ।
ফযরের নামাযে প্রথম রাকআতে ত্রিশ আয়াত পাঠ করা । দ্বিতীয় রাকআতে কুড়ি আয়াতপাঠ করা ।
জোহরের নামাজে ত্রিশ আয়াত পাঠ করা ।
আছরের নামাজে ২০ (কুড়ি) আয়াত পাঠ করা ।
মাগরিবের নামাজে ছোট ছোট সূরাহ পাঠ করা ।
এশার নামাজে বিশ আয়াত পাঠ করা ।
নামাযের মাকরূহাত
১)চাদর বা জামা না পড়িয়া কাঁধে ঝুলাইয়া রাখা ।
২) ময়রা ধুলা-বালি লাগিবার ভয়ে কাপড় জামা গুটানো ।
৩) আঙ্গুল মটকান ।
৪) বস্ত্র শরীর অথবা দাঁড়ির সহিত খেলা করা ।
৫) এদিক ওদিক দেখা ।
৬) চুল মাথার উপরিভাগে বাঁধা ।
৭) বিনা ওজরে সেজদার স্থানের ইট-পাথর সরান ।
৮) আলস্যভরে শরীর মোড়ামুড়ি করা ।
৯) সিজদার সময়ে হাত বিছাইয়া দেওয়া ।
১০) আগের কাত।রে স্থান থাকিতে পিছনের কাতারে দাঁড়ানো ।
১১) অবহেলা করিয়া খালি মাথায় নামায পড়া ।
১২) আকাশের দিকে তাকান ।
১৩) ভাল কাপড় থাকা সত্ত্বেও মন্দ কাপর পড়ে নামায পড়া ।
১৪) নামাযের মধ্যে কপালের মাটি মুছিয়া ফেলা ।
১৫) কোন প্রাণীর ছবি সম্মুখে ডাইনে বামে মস্তকের উপর বা কাপড়ের মধ্যে থাকা ।
১৬) সিজদার সময়ে বিনা কারণে হাটুর পূর্বে হাত মাটিতে রাখা ।
১৭) বিনা কারণে আসন পাতিয়া বসা ।
১৮) ফরয নামাযে এক সূরা বার বার পড়া ।
১৯) কোন মানুষের মুখের দিক হইয়া নামায পড়া ।
২০) সিজাদাতে পিঠ উভয় উরুর সহিত মিলাইয়া দেওয়া ।
২১) এক হাত বা তদুর্ধ স্থানে ইমামের দাঁড়ান ।
২২) নাক-মুখ ঢাকিয়া নামায পড়া ।
২৩) উভয় সিজদার মধ্যে অথবা তাশহুদ পড়িবার সময়ে কুকুরের ন্যায় বসা ।
২৪) দুই হাতে মাটি ভর দিয়া উঠা ।
২৫) কোন সুন্নত পরিত্যাগ করা ।
নামাযের নিষিদ্ধ সময়
সূর্যোদয়ের সময়, ঠিক দ্বিপ্রহর এবং সূর্যাস্তের সময় যে কোন নামায পড়া, সিজদার তেলাওয়াত করা জায়েয নাই। যদি আছরের নামায না পড়িয়া থাকে তবে শুধু মাত্র ঐ দিনকার আছরের নামায সূর্যাস্তের সময় পড়িতে পারিবে । তবে উহাও মাকরূহ তাহারীমির সাথে আদায় হইবে ।
সুন্নত ও নফল নামাযের নিষিদ্ধ সময়
১) ফজরের সময় হইলে ফজরের সুন্নত দুই রাকাআত ছাড়া অন্য কোন সুন্নত বা নফল পড়া।
২) সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামায পড়ার পূর্ব পর্যন্ত ।
৩) উভয় ঈদের নামায পড়া পর্যন্ত। এই সমস্ত সময় নামায পড়া মাকরূহ । কাযা, জানাযা নামায, সিজদায়ে তেলাওয়াত করা জায়েয আছে ।
৪) ফরয নামাযের ইক্বামত বা জামাতের সময় ও সুন্নত বা নফল পড়া মাকরূহ ।
৫) নামাযের সময় সংকীর্ণ হইলে ওয়াক্তিয়া ফরয ব্যতীত অন্য যে কোন নামায পড়া মাকরূহ । জুমআর খুৎবার জন্য ইমাম মিম্বরে দাঁড়াইলেই সুন্নত বা নফল পড়া মাকরূহ ।
দোয়া কুনুত
ইহা বিতরের নামাযে পড়তে হয়
اَللَّمُمَّ
اِنَّ نَسْتَعِيْنُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِىْ عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ وَلاَ نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَّفْجُرُكَ-اَللَّهُمَّ اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّىْ وَنَسْجُدُ وَاِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ وَنَرْجُوْ رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ اِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাঈনুকা ওয়া নাসতাগ ফিরুকা ওয়ানুমিনু বিকা ওয়ানাতাওয়াক্কালু আলাইকা ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইর । ওয়া নাসকুরুকা আলা নাক ফুরুকা ওয়ানাখলাউ উয়ানাত রুকু মাইয়্যাফযুরুকা । আল্লাহুম্মা ইয়্যাকানা বুদু ওয়ালাকা নুছালি্ল ওয়া নাস জুদু ওয়া ইলাইকা নাসয়া ওয়া নাহফিদু ওয়া নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা ইন্না আজাবাকা বিলকুফফারি মূলহিক ।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমরা তোমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিতেছি, তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি, তোমার ভরসা করিতেছি । তোমার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিতেছি, তোমার উপর ঈমান আনিতেছি, তোমার ভরসা করিতেছি তোমার গুণগান করিতেছি এবং তোমারই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি । আমরা তোমাকে অস্বীকার করি না । যাহারা তোমার হুকুম অমান্য করে তাহাদের সঙ্গে আমরা সংশ্রব সংসগ্র পরিত্যাগ করি । হে আল্লাহ! আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমারই খেদমতে হাজির হই এবং তোমার রহমতের আশা করি ও তোমার শাস্তিকে ভয় করি । নিশ্চই তোমার আজাব অবিশ্বাসিগণ ভোগ করিবে । দোয়ায়ে মাসুরা
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِىْ وَلِوَ الِدَىَّ وَلِمَنْ تَوَالَّدَ وَلِجَمِيْعِ الْمُؤْ مِنِيْنَ وَالْمُؤْ مِنَاتِ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالاْاَحْيَاءِ مِنْهُمْ وَالْاَمُوْ اَتْ بِرَحْمَتِكَ يَااَرْحَمَرَّحِمِيْنَ
উচ্চারনঃ আল্লাহুমাগ ফিরলী ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিমান তাওয়াল্লাদা ওয়ালি জামীঈল, মু’মিনীনা ওয়াল মুমিনাত, ওয়াল মুসলিমীনা ওয়াল মুসলিমাত, ওয়াল আহ্ইয়ায়ি মিনহুম ওয়াল আমুয়াত, বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন ।
অনুবাদঃ হে পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা! আমাকে, আমার পিতা মাতাকে, সন্তান-সন্ততিকে, সমস্ত মু’মিন পুরুষ ও নারীকে এবং জীবিত মৃত সমস্ত মুসলিম নর-নারীকে ক্ষমা কর ।
দুরূদ শরীফ
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى اِبْرَ اهِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَ اهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ-
اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى اِبْرَ اهِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَاهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌمَّجِيْدٌ
উচ্চারনঃ আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা মুহাম্মাদিঁ ওয়া আলা আলি মুম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামিদুম্মাজীদ । আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ ।
অনুবাদঃ যে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর ঐরূপ আশীর্বাদ অবতীর্ণ কর যেইরূপ আর্শীবাদ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর অবতীর্ণ করিয়াছ । নিশ্চই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম । হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর সেইরূপ অনুগ্রহ কর যে রূপ অনুগ্রহ ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁহার বংশরগণের উপর করিয়াছ । নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম ।
আত্তাহিয়াতু
اَلتَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاةِ وَالطَّيِّبَاتُ اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُه‘ – اَلسَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصَّا لِحِيْنَ – اَشْهَدُ اَنْ لاَّ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدً عَبْدُه‘ وَرَسَوْلُه‘-
উচ্চারন: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্তায়্যেবাতু আস্-সালামু আলাইকা আইয়ু্যহান্নাবীয়ু্য ওয়া রামাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আস্-সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন । আশহাদু আল-লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু ।
অনুবাদ: জান এবং মাল সর্বপ্রকার ইবাদতই আল্লাহুর জন্য । হে পয়গাম্বর, আপনার উপর আল্লাহর কৃপা, বরকত এবং শান্তি বর্ষিত হইক । আমাদের উপর এবং আল্লাহর পূণ্যবান বান্দাগণের উপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কেহ উপাস্য নাই । আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, নিশ্চই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁহার বান্দা ও রাসূল ।
জায়নামাযে দাঁড়াইয়া পড়িবার দো’আ
اِنِّىْ وَجَّهْتُ وَجْهِىَ لِلَّذِىْ فَطَرَالسَّمَوَتِ وَاْلاَرْضَ حَنِيْفَاوَّمَااَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ
উচ্চারণঃ ইন্নি ওয়াজ্জাহাতু ওজহিয়া লিল্লাযী ফাতারাচ্ছামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন ।
অনুবাদ: নিশ্চই আমি তাঁহার দিকে মুখ ফিরাইলাম, যিনি আসমান জমিন সৃষ্টি করিয়াছেন । আমি মুশরিকদিগের দলভুক্ত নহি ।
তাকবীরে তাহরীমা
এই তাকবীরের দ্বারাই নামাজ আরম্ভ করা হয়
سُبْحَانَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَا لَى جَدُّكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবাহানাকা আল্লাহুমা ওয়া বিহামদিকা ওয়াতাবারা কাসমুকা ওয়া তায়ালাজাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা ।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র সকল প্রশংসা তোমারই । তোমার নাম মঙ্গলময় । তোমার মহিমা অতীব উচ্চ । তুমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই ।
যে সকল কারনে নামায ভঙ্গ হয়
যে সকল কাজ দ্বারা নামায নষ্ট হয, তাহাকে “মোফছেদাতে নামাজ” বলে । ঐরূপ কাজ করিলে নামায পুনরায় পড়িতে হয় ।
যে কারণে নামাজ নষ্ট হইয়া যায় ।
১) নামাযের মধ্যে আজান্তে, ভ্রমে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কথাবার্তা বলা ।
২) কাহাকেও ছালাম করা ।
৩) ছালামের উত্তর দেওয়া ।
৪) উঃ আঃ শব্দ করা ।
৫) বেদনা অথবা শোকে শব্দ করিয়া ক্রন্দন করা ।
৬) বিনা ওজরে কান্না ।
৭) নামাযের কোন ফরয ত্যাগ করা ।
৮) ছতরের একচতুর্থাংশ পর্যন্ত কাপড় আলগা হইয়া যাওয়া ।
৯) কোরান শরীফ খুলিয়া পড়া ।
১০) নাপাক স্থানে সেজদা করা ।
১১) হাচির উত্তরে “ইয়ারহামুকুমুল্লাহ” বলা ।
১২) পানাহার করা ।
১৩) প্রত্যেক রোকনে দুইবারে অতিরিক্ত চুলকান ।
১৪) সুসংবাদে “আলহামদুলি্লল্লাহ” এবং দুঃসংবাদে “ইন্নালিল্লা” পড়া ।
১৫) ইমামের পূর্বে মোক্তাদির কোন রোকন্ আদায় করা ।
১৬) নামাযের মধ্যে অতিরিক্ত কাজ করা ।
জায়নামাযে দাঁড়াইয়া পড়িবার দো’আ
اِنِّىْ وَجَّهْتُ وَجْهِىَ لِلَّذِىْ فَطَرَالسَّمَوَتِ وَاْلاَرْضَ حَنِيْفَاوَّمَااَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ
উচ্চারণঃ ইন্নি ওয়াজ্জাহাতু ওজহিয়া লিল্লাযী ফাতারাচ্ছামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন ।
অনুবাদ: নিশ্চই আমি তাঁহার দিকে মুখ ফিরাইলাম, যিনি আসমান জমিন সৃষ্টি করিয়াছেন । আমি মুশরিকদিগের দলভুক্ত নহি ।
তাকবীরে তাহরীমা
এই তাকবীরের দ্বারাই নামাজ আরম্ভ করা হয়
سُبْحَانَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَا لَى جَدُّكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবাহানাকা আল্লাহুমা ওয়া বিহামদিকা ওয়াতাবারা কাসমুকা ওয়া তায়ালাজাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা ।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র সকল প্রশংসা তোমারই । তোমার নাম মঙ্গলময় । তোমার মহিমা অতীব উচ্চ । তুমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই ।
ফযরের সুন্নত দুই রাকাআতের নিয়্যাত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى رَكْعَتَىْ صَلَوةِ الْفَجْرِ سُنَّةُ رَسُوْلُ للَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকা’আতাই সালাতিল ফাজরে সুন্নাতু রাছুলিল্লাহি তা’আলা মুতাওয়াজ্জিহান ইলাজিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
অনুবাদ: কোবালামুখী হইয়া ফযরের দুই রাকায়াত সুন্নত নামায আল্লাহর জন্য পড়িবার নিয়ত করিলাম আল্লাহু আকবার ।
ফযরের দুই রাকাআত ফরয নামাযের নিয়্যাত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى رَكْعَتَىْ صَلَوةِ الْفَجْرِ فَرْضُ للَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকা’আতাই সালাতিল ফাজরে ফারযুল্লাহি তা’আলা মুতাওয়াজ্জিহান ইলাজিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
অনুবাঃ কোবালা মুখী হইয়া ফযরের দুই রাকায়াত ফরয নামায আল্লাহর জন্য পড়িবার নিয়ত করিলাম আল্লাহু আকবার।
যোহরের সুন্নাত চার রাকাত নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْظُهْرِسُنَّةُ رَسُوْلِ للَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিল জোহরে সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আকবর।
যোহরের ফরয চার রাকাত নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْظُهْرِ فَرْضُ اللَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিজ জোহরে ফারজুল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আকবর।
যোহরের সুন্নাত দুই রাকাত নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى رَكْعَتِ صَلَوةِ الْظُهْرِسُنَّةُ رَسُوْلِ للَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকাআতি ছালাতিজ জোহরে সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আকবর।
যোহরের নফল দুই রাকাআতের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى رَكْعَتِ صَلَوةِالْنَفْلِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারণঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকাআতি ছালাতিল নফলে মোহাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
আছরের সুন্নাত চার রাকাআত নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْعَصْرِسُنَّةُ رَسُوْلِ للَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিল আসরি সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আকবর।
আছরের ফরয চার রাকাআত নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْعَصْرِ فَرْضُ اللَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিল আসরি ফারযুল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আকবর
মাগরিবের তিন রাকাআত ফরয নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى ثَلَثَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْمَغْرِبِ فَرْضُ اللَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ-
উচ্চারণঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা সালাছা রাকায়াতি ছালাতিল মাগরিবে ফারযুল্লাহি তায়ালা মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতি শারিফাতি আল্লাহু আকবার।
মাগরিবের দুই রাকাআত সুন্নাত নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى رَكْعَتِ صَلَوةِ الْمَغْرِبِ سُنَّةُ رَسُوْ ا الِلَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
উচ্চারণঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকায়াতি ছালাতিল মাগরিবে সুন্নাতু রাসুলল্লাহি তা’য়ালা মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতি শারিফাতি আল্লাহু আকবার।
এশার চারি রাকাআত সুন্নত নামযের নিয়্যাত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَالَى اَرْبَعَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْعِشَاءِسُنَّةُ رَسُوْلِ للَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিল এশাই সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা এশার চারি রাকাআত ফরয নামযের নিয়্যাত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْعِشَءِ فَرْضُ اللَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিল এশাই ফারযুল্লাহি তা’য়াল মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবর
বিতিরের নামাযের নিয়্যাত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى ثَلَثَ رَكْعَتِ صَلَوةِ الْوِتْرِوَاجِبُ اللَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
উচ্চারনঃ নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহি তা’আলা সালাছা রাকায়াতি ছালাতিল বিতরে ওয়াজিবুল্লাহি তা’য়ালা মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ্ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
বিতরের নামায পড়িবার নিয়ম
এশার নামায পড়িবার পর বিতরের তিন রাকাআত নামায পড়িতে হয়, ইহা ওয়াজিব। পুর্বে উল্লেখিত তিন রাকাআত বিশিষ্ট নামাযের মত বেতরের নামায পড়িবে। তবে তৃতীয় রাকাআতে সূরায়ে ফাতিহার পর অন্য কোন সূরা বা আয়াত পড়িয়া আল্লাহু আকবর বলিয়া উভয় হস্ত কান পর্যন্ত উঠাইয়া পুনঃ হাত বাঁধিয়া দোয়ায়ে কুনুত পড়িবে। তারপর রুকু সিজদা ইত্যাদি যথারীতি আদায় করিয়া নামায শেষ করিবে।
রমজান মাস ব্যতীত সকল সময়ে বিতরের নামায একা একা এবং নিঃশব্দে পড়িতে হইবে। রমজান মাসে এই নমায জামায়েতের সাথে আদায় করা মুস্তাহাব। রমজান মাসে তারাবীর নামায শেষে ইমাম সাহেব প্রত্যেক রাকাতেরই সজোরে কেরাতে পাঠ করিবে এবং তৃতীয় রাকাআতে ইমাম সাহেব কেরাআত শেষ করিয়া সশব্দে “আল্লাহু আকবর” বলিয়া কান পর্যন্ত হাত উঠাইয়া পুণরায় তাহা বাঁধিবে।
মোক্তাদিগণ চুপে চুপে শুধু ইমামের অনুকরণ করিবে। হাত বাঁধিয়া সবাই চুপে চুপে দোয়ায়ে কুনুত পড়িবে। পরে যথাবিহিত ইমাম সাহেব রুকু, সিজাদা, তাশাহুদ, দরূদ পড়িয়া ছালাম করিয়া নামায শেষ করিব, মোক্তাদিগহণও তাহার অসনুসরণ করিবে।
যদি কেহ দোয়ায়ে কুনুত না জানে তবে না শিখা পর্যন্ত সে দোয়য়ে কুনুতের স্থলে নিম্নেক্ত দোয়া পড়িবে।
উচ্চারনঃ রাব্বানাআতিনা ফিদ্দুনিয়া হাছানাতাও ওয়াফিল আখিরাতে হাচানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার।
অথবা, তিন বার আয় আল্লাহ আমাকে মাফ কর, পড়িবে অথবা তিন বার (আল্লাহুম্মাগ ফিরলী, ইয়ারাব্বী) অর্থৎ হে আমার পতিপালক পড়িবে। কিন্তু সাবধান দোয়ায়ে কুনুত শিখিতে বিলম্ব মোটেও করিবে না।
কাযা নামাযের নিয়্যাত
কাযা নামায এবং ওয়াক্তিয়া নামাযের নিয়ত একই রকম তবে এইটুক পার্থক্য যে কাযা নামাযে (আন উসালি্লয়া) শব্দের জায়গায় (আন আকদিয়া) এবং যে নামায তাহার নাম বলিয়া (আল ফাইতাতে বলিতে হইবে। যথা- আছরের নামায কাযা হইলে নিম্নরূপ নিয়ত বলিবেঃ
نَوَيْتُ اَنْ اَقْضِىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ رَكْعَاتِ صَلَوةِ الْعَصْرِ الْفَا ئِتَةِ فَرْضُاللَّهِ تَعَا لَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِالشَّرِيْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
উচ্চারণঃ নাওয়াইতুয়ান আকদিয়া লিল্লাহি ত’আলা আরবায়া রাকাআতি ছালাতিল আছরিল ফায়েতাতি ফারযুল্লাহি তা’আলা মোতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
কাযা নামায পড়িবার নিয়ম
যে কোন জরুরী কারণে সময়মত নামায পড়তে না পারিলে ঐ নামায অন্য নামাযের পূর্বে আদায় করাকে কাযা নামায বলে। কাযা নামায দুই প্রকার যথা ।
১। ‘ফাওয়ায়েতে কালীল’ অর্থাৎ অল্প কাযা পাঁচ ওয়াক্ত পরিমাণ নামায কাযা হইলে উহাকেই ‘ফাওয়ায়েতে কালীল’ বা অল্প কাজা বলে।
২। ‘ফাওয়ায়েতে কাছির’ অর্থাৎ বেশি কাযা। পাঁচ ওয়াক্তের অধিক যত দিনের নামাযই কাযা হউক না কেন উহাকে ‘ফাওয়ায়েতে কাছির’ বা অধিক কাযা বলা হয়। এ ধরনের কাযা নামায সকল ওয়াক্তিয়া নামাযের পূর্বে পড়িবে ।
কিন্তু,
(ক) কাযার কথা ভুলিয়া গেলে অথবা
খ) ওয়াক্তিয়া নামাযের ওয়া্কত সস্কীণৃ হইয়া গেলে বা
গ) কাযা পাঁচ ওয়াক্তের বেশী হইলে কাযা নামায পরে পড়া যাইতে পারে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামায বা তার কম নামায না পড়িয়া থাকিলে তাহার তরতীবের প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে। আগের নামায আগে, পরের নামায পরে পড়িতে হইবে। যথঃ কোন ব্যক্তির ফরজ এবং যোহরের নামায তরক হইয়া গিযাছে; এখন আছরের নামায পড়িবার পূর্বে সর্ব প্রথম ফজরের কাযা তারপর যোহরের কাযা আদায় করিতে হইবে। তারপর আছরের ওয়াক্তিযা নামায আদায় করিবে।
১) ফরয নমাযের কাযা ফরয।
২) ওয়াজিব নামাযের কাযা ওয়াজিব।
৩) সুন্নত নামাযের কাযা পড়িতে হয় না। কিন্তু ফজরের সুন্নতের কাযা আদায় করিতে হইব।
৪) কাযা নামায জামায়াতের সহিত আদায় করিলে ইমাম কেরাত জোরে পড়িবেন। তবে যোহর এবং আছরে চুপে চুপে পড়িবেন।
৫) এক মাস বা তার চেয়ে বেশী দিনের নামায কাযা হইয়া থাকিলে উক্ত পরিমাণ সময়ের কাযা আদায় করিবে এবং তরতীবের প্রতি লক্ষ্য রাখিবে।
৬) জীবনে যে নামায পড়ে নাই বা কত নামায তরক করিয়াছে তাহার হিসাবও নাই। সে যদি এখন কাযা করিতে চায়, তবে প্রথমে নামাযের পূর্বে তরতীব অনুযায়ী কাযা আদায় করিতে থাকিব, ইহাকে ‘ওমরী কাযা’ বলে। ইহাতে অশেষ ছওয়াব আছে।
কাযা নামাযের নিয়ত করিবার সময় নামাযের উল্লেখ করিয়া নিয়ত করিতে হইবে।
কবর যিয়ারতের বিবরণ
মৃত ব্যক্তিগণের রুহের মাগফিরাত ও তাহাদের মঙ্গল কামনার জন্য কবরস্থানে উপস্থিত হইয়া সালাম দেয়া এবং দোয়া দরুদ ও কোরানের সূরা কেরাআত ইত্যাদি পাঠ করিয়া আললাহপাকের নিকট প্রার্থনা করাকে যিয়ারত বলে। কবর যিয়ারত দ্বারা যিয়ারত কারীর অনেক ফায়েদা হাছিল হয়, ইহাতে তাহার মনের ধর্মভাব এবং মৃতু্যর কথা জাগরিত হয়।
স্ত্রীলোকগণও কবর যিয়ারত করিতে পারেন। যদি তাঁহাদের বাপ-মার কবর এমন স্থানে থাকে যেখানে বেগানা পুরুষের কবর নাই তাহা হইলে উহা যিয়ারত করিতে পারেন।
কবর যিয়ারতের নিয়ম
কবর যিয়ারতের নিয়তে কবরস্থানে উপস্থিত হইয়া পশ্চিম দিকে পিঠ করিয়া কবরের দিকে ফিরিয়া দন্ডায়মান হইবে। তারপর সর্ব প্রথম কবর যিয়ারতের দোয়া বা সালাম পাঠ করিবে। তারপর বিস্মিল্ললার সাথে ক্রমান্বয়ে সূরা তাকাছুর, সূরা ফীল, সূরা কুরাইশ, চারকুল, আয়াতুল কুরছি এবং সম্ভব হইলে সূরা ইয়াসিন পড়া যায় আরও অধিক পড়িলে বেশী ভাল কথা।
কবর যিয়ারতের দোয়া
اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ يَا اَهْلَ الْقُبُوْرِ مِنَالْمُسْلِمِيْنَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ – اَنْتُمْ لَنَا سَلْفَ وَنَحْنُ لَكُمْ طَبَعٌ وَاِنَّا اِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لاَ حِقُوْنَ يَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِ مِيْنَ مِنَّا مِنَ الْمُسْتَا خِرِيْنَ نَسَئَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمْ وَيَرْحَمُنَا اللهُ وَاِيَّا كُمْ –اَمِيْنَ
উচ্চারণ ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল ক্কুবুরে মিনাল মুসলিমিনা, ওয়াল মুসলিমাতি, ওয়াল মু’মিনীনা ওয়াল মুমিনাতে আনতুম লানা সালফা ওয়ানাহনু লাকুম তারাউ ওয়া ইন্না ইনশায়াললাহু বেকুম লা-হেকুউনা ইয়ারহামুললাহুল মুস্তাক্কদেমীনা মিন্না মিনাল মুস্তাখেরীনা। নাসায়ালুললাহা লানা ওয়া লাকুম ওয়াইয়ারহা মুনাললাহু ওয়া ইয়্যাকুম-আমীন।
সূরা কেরাআত এবং এই সমস্তের ছওয়াব মৃতের রুহের প্রতি বখশিষ করিয়া দিবে।
লাশ কবরে শোয়াইবার দোয়া
بِسْمِ اللهِ وَ عَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ-
উচ্চারণঃ বিস্মিললাহি ওয়া আলা মিললাতি রাসূলিললাহি।
অনুবাদঃ আললাহপাকের নামে ও তাঁহার রাসূলের মাযহাবের (ধর্মমত) উপর (ইহাকে) সোপর্দ করিলাম।
মুর্দা কবরে শোয়াইয়া দিবার পর উহার উপরিভাগে বাঁশ অথবা অন্য কোন গাছ একখানার সাথে আর একখানা গায় গায় মিলাইয়া স্থাপন করিবে। বাঁশ বিছান হইলে উহার উপরে চাটাই, কলাপাতা, হুগলা অথবা অন্য কোন বস্তু বিছাইয়া দিবে। তারপর মাটি দ্বারা উহা ভাল করিয়া আটকাইয়া দিবে। প্রথমে পাঠ করিবে এবং এক এক মুষ্টি মাটি কবরে দিবেঃ
১।مِنْهَاخَلَقْنَاكُمْ মিনহা খালাক্কনাকুম। অথর্াৎ ইহাতেই তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছি।
২।وَفِيْهَا نُعِيْدُ كُمْ ওয়া ফিহা নুয়ীদুকুম। অথর্াৎ (আবার) ইহাতেই তোমাদিগকে প্রত্যাবর্তন করাইব।
৩।وَمِنْهَا نُخْرِجِكُمْ تَارَةً اُخْرَى ওয়ামিনহা নুকরিজুকুম তারাতান উখরা। অথর্াৎ (পুনর্বার) ইহা হইতে তোমাদিগকে বহির্গত করিব।
এইভাবে তিন মুষ্টি করিয়া মাটি দিবার পর প্রথমে কবরের মাথার দিক হইতে (উত্তর দিক) কোদাল দ্বারা বেশী করিয়া মাটি টানিয়া দিতে থাকিবে। কবরের চারিদিকে নীচু রাখিয়া মধ্যস্থান এক বিঘতের একটু বেশী পরিমান উঁচু করিবে। ইহার চতুর্দিকে চারিটি কোণের সৃষ্টি না করিয়া সমস্ত কবরটিকে একটি মাছের পিঠের ন্যায় আকৃতি বানাইয়া দিবে। কবরের দুই দিকে লাশের মাথা ও পা বরাবর জোড়া করিয়া দুইখানি ডাল পুঁতিয়া রাখিবে।
কবর খনন ও দাফনের বিবরণ
কবর দৈর্ঘ্য লাশ অপেক্ষা কিছু বড় এবং প্রস্থ দৈর্ঘ্যর অন্ততঃ অর্ধেক পরিমাণ খনন করিবে। গভীরতায় বুজ অথবা নাভী সমান করিবে। কবর সাধারণতঃ দুই রকম করা হয়। (১) শক কবর (খাড়া কবর) এবং (২) লহদ কবর।
শক কবর হইলে উপর হইতে একেবারে খাড়া ভাবে সোজা নীচের দিকে বরক অথবা নাভী পর্যন্ত খনন করা। এই প্রকার কবর হইতে অনেক সময় বন্য জন্তুরা লাশ টানিয়া উপরে উঠাইয়া ফেলে। কাজেই ইহা মোটেই নিরাপদ নয়।
লহদ কবর হইল উপর হইতে কিছুদূর পর্যন্ত খাড়া ভাবে খনন করিয়া তারপর এক পাশ্বর্ে বাকা করিয়া মাটির নীচে এই পরিমাণ স্থান খনন করতে হবে যাহাতে সচ্ছন্দে একটি লাশ তার মধ্যে শোয়াইয়া রাখা যায়। এই প্রকার কবর হইতে কোন জানোয়ার কতর্ৃক লাশ আক্রান্ত হইবার ভয় থাকেনা। বর্তমানে প্রায় সব দেশেই এই জাতীয় কবরই বেশী খনন করা হয়ে থাকে।
মৃতদেহ কবরস্থানে নিবার বিবরণ
মৃতদেহের খাঁটিয়া কবরস্থানে লইয়া যাওয়া ফরযে কেফায়া। কোন এক প্রশস্ত অথচ পবিত্র স্থানে বসিয়া জানাযার নামায আদায় করিয়া লাশ বহন করিয়া কবরস্থানে লইয়া যাইবে।
মৃত ব্যক্তির চার জন পরহেজগার নিকট আত্মীয় লাশের খাটের চারটি পায়া ধারণ করিয়া কাঁধে উঠাইয়া লইবে।
লাশের মাথা সম্মুখে রাখিয়া চলিতে থাকিবে। কবরস্থান বেশী দূরে হইলে মাঝে মাঝে খাট বহনকারীগণ স্থান পরিবর্ত করিয়া স্ব-স্ব কোণা হইতে বিপরীত কোণায় গিয়া খাঁট ধারণ করিবে।
লাশ কোন ক্ষুদ্র শিশুর হইলেও একজন লোকে ও ছোট খাঁটে বহন করিবে না।
কবরস্থানে পেঁৗছাইয়া কবরের পশ্চিম পাশ্বর্ে জানাযার খাট উত্তর মুখী করিয়া নামাইয়া রাখিবে।
জানাযা নামাযের কিছু মাছালা
ইমাম ভুলে পাঁচ তাকবীর বলিলে মোক্তাদিগণ চারি তাকবীর পর্যন্ত বলিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিবেন এবং ইমামের সংঙ্গে একত্রেই সালাম ফিরাইবে। কোন লোক জানাযার নামাযে ইমামের কয়েকটা তাকবীর না বলার পর আসিয়া শরীক হইলে সে তাহরীমার তাকবীর না বলিয়া কিছু সময় ইমাম যখন তাকবীর বলিবেন অমনি তাহার সহিত তাকবীর বলিয়া নামাযে শরীক হইয়া যাইবে। ইহাই তাহার জন্য তাকবীরে তাহরিমা হইবে। তারপর যে তাকবীরগুলি ইমামের সংগে না পাইয়াছে তাহাই বলিবে। তাহাকে আর কিছুই পড়িতে হইবে না।
কোন লোক ইমামের চার তাকবীর হইয়া যাওয়ার পর নামাজে শরীক হইলে সে ইমামের সালাম ফিরাইবার পরে শুধু তাকবীর গুলো বলিয়াই সালাম ফিরাইবে।
কাহারও মৃতু্য সংবাদ শুনিয়া দূরবর্তী এলাকায় তাহার জন্য গায়েবানা নামায পড়িলে জায়েয হইবে।
কোন লোককে জানাযার নামায ব্যতীত দাফন করিলে তাহার উপরে তিনদিন পর্যন্ত জানাযার নামায পড়া জায়েয আছে।
কোন সন্তান মৃত ভূমিষ্ট হলে তাহার জন্য জানাযার নামায পড়িতে হয় না।
মসজিদের অভ্যন্তরে জানাযার নামায পড়া মাকরূহ।
কেহ জানাযা নামাযের দোয়া না জানিলে সে শুধু “আললাহুম্মাগ ফেরলিল মুমিনীনা ওয়াল মুমিনাতে” এইটুকু বলিবে।
জানাযা নামাযের নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُؤَدِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ تَكْبِيْرَاتِ صَلَوةِ الْجَنَا زَةِ فَرْضَ الْكِفَايَةِ وَالثَّنَا ءُ لِلَّهِ تَعَا لَى وَالصَّلَوةُ عَلَى النَّبِىِّ وَالدُّعَا ءُلِهَذَا الْمَيِّتِ اِقْتِدَتُ بِهَذَا الاِْمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
উচ্চারণ নাওয়াইতু আন উয়াদ্দিয়া লিললাহে তায়ালা আরবাআ তাকরীরাতে ছালাতিল জানাযাতে ফারযুল কেফায়াতে আচ্ছানাউ লিললাহি তায়ালা ওয়াচ্ছালাতু আলান্নাবীয়্যে ওয়াদ্দোয়াউ লেহাযাল মাইয়্যেতে এক্কতেদায়িতু বিহাযাল ইমাম মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতে আললাহু আকবার।
অনুবাদ ঃ আমি আললাহর উদ্দেশ্যে জানাযা নামাজের চারি তাকবীর ফরযে কেফায়া কেবলামুখী হয়ে ইমামের পিছনে আদায় করার মনস্থ করলাম। ইহা আললাহু তায়ালার প্রশংসা রাসূলের প্রতি দরূদ এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া (আশর্ীবাদ) আললাহ মহান।
নিয়তের মধ্যে অন্যান্য জামাতের নামাযের নিয়তের ন্যায় ইমাম তাহার অতিরিক্ত খাছ কালাম (আনা ইমামুলেলমান হাজারা ওয়া মাইয়্যাহজুরু) এবং মোক্তাদিগণ তাহাদের অতিরিক্ত খাছ কালামটি পাঠ করিলে। (একতেদাইতু বেহাযাল ইমাম) আর নিয়তের ‘লেহাযাল মাইয়্যেতে’ শব্দটি কেবল পুরুষ লাশের বেলায় বলিতে হইবে, কিন্তু স্ত্রী লাশ হইলে ঐ শব্দটির স্থলে ‘লেহাযিহিল মাইয়্যেতে’ বলিতে হইবে।
নিয়তের পরে ছানা
سُبْحَا نَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَا لَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ ঃ সুবহা-নাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারা কাসমুকা ওয়া তায়ালা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানাউকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা।
অনুবাদ ঃ হে আললাহ আমরা তোমার পবিত্রতার গুণগান করিতেছি। তোমার নাম মংগলময় এবং তোমার স্তুতি অতি শ্রেষ্ঠ, তুমি ব্যতীত আর কেহই উপাস্য নাই।
ছানার পরে তাকবীর বলিয়া তাশাহুদের পরের দরূদ পড়িতে হয়।
দুরুদ শরীফ
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَ اهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ- اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَا هِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌمَّجِيْدٌ
উচ্চারন ঃ আললাহুম্মা সাললিআলা মুহাম্মাদিঁ ওয়া আলা আলি মুম্মাদিন কামা সাললাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামিদুম্মাজীদ। আললাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ।
অনুবাদ ঃ যে আললাহ! মুহাম্মদ (সাললাললাহু আলাইহি ওয়া সাললাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর ঐরূপ আশীর্বাদ অবতীর্ণ কর যেইরূপ আর্শীবাদ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর অবতীর্ণ করিয়াছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম। হে আললাহ! মুহাম্মদ (সাললাললাহু আলাইহি ওয়া সাললাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর সেইরূপ অনুগ্রহ কর যে রূপ অনুগ্রহ ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁহার বংশরগণের উপর করিয়াছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম।
জানাযার দোয়া
اَلَّهُمَّ اغْفِرْلحَِيِّنَاوَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَاُنْثَا نَا اَللَّهُمَّ مَنْ اَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَاَحْيِهِ عَلَى الاِْسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَىالاِْيمَانِ بِرَحْمَتِكَ يَاَارْ حَمَالرَّحِمِيْنَ
উচ্চারণ ঃ আললাহুম্মাগফিরলি হাইয়্যেনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহীদিনা ওয়া গায়িবিনা ও ছাগীরিনা ও কাবীরিনা ও যাকারিনা ও উনছানা। আললাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলামী ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ ফাহু আলাল ঈমান বেরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহীমিন।
অনুবাদঃ হে আললাহ্ আমাদের জীবিত ও মৃত উপস্থিত ও অুপস্থিত বালকও বৃদ্ধ পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগকে ক্ষমা কর। হে আললাহ আমাদের মধ্যে যাহাদিগকে তুমি জীবিত রাখ তাহাদিগকে মৃতু্য মুখে পতিত কর। তাহাদিগকে ঈমানের সাথে মৃতু্য বরণ করাইও।
লাশ যদি নাবালক ছেলে হয় তবে নিচের দোয়া পড়তে হবে
اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًاوْ اَجْعَلْهُ لَنَا اَجْرً اوَذُخْرًا وَاجْعَلْهُ لَنَا شَا فِعًة وَمُشَفَّعًا-
উচ্চারণ ঃ আললাহুম্মাজ আলহুলানা ফারতাঁও ওয়াজ আলহুলানা আজরাও ওয়া যুখরাঁও ওয়াজ আলহুলানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ্ফায়ান।
অনুবাদ ঃ হে আললাহ! উহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী কর ও উহাকে আমাদের পুরস্কার ও সাহায্যের উপলক্ষ কর এবং উহাকে আমাদের সুপারিশকারী ও গ্রহনীয় সুপারিশকারী বানাও।
লাশ যদি নাবালেগা মেয়ে হয় তবে নিচের দোয়া পড়তে হবে।
اَللَّهُمَّ اجْعَلْهَ لَنَا فَرْطًا وَاجْعَلْهَ لَنَا اَجْرً اوَذُخْرًا وَاجْعَلْهَ لَنَا شَا فِعً وَمُشَفَّعًا-
উচ্চারণ ঃ আললাহুম্মাজ আলহা লানা ফারতাঁও ওয়াজ আলহা লানা আজরাঁও ওয়া যুখরাঁও ওয়াজ আলহা লানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ্ফায়ান।
অনুবাদ ঃ হে আললাহ! ইহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী কর ও ইহাকে আমাদের পুরস্কার ও সাহায্যের উপলক্ষ কর। এবং ইহাকে আমাদের সুপারিশকারী ও গ্রহনীয় সুপারিশকারী বানাও। দুইহাত দুইপাশে ঝুলাইয়া ইমাম সাহেব ডানে এবং বামে ছালাম ফিরাইবে।
জানাযা নামাজ পড়িবার নিয়ম
মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাইয়া, কাফন পরাইয়া তাহার মাগফিরাত ও পরকালে মুক্তির জন্য কতক লোক একত্র হইয়া যে নামায পড়িতে হয়, তাহাকে জানাযার নামায বলে। এই নামায মুসলমানদের উপর ফরযে কেফায়া অথাৎ জানাযার সংবাদ শ্রবণকারী সকল লোকের পক্ষ হইতেই ফরয আদায় হইয়া যায়, আর কেহই আদায় না করিলে প্রত্যেককেই গুণাহগার হইতে হইবে।
লাশকে গোসল করাইয়া কাফন পরাইয়া একটি প্রশস্ত পবিত্র স্থানে খাটের উপরে উত্তর শিয়রী করিয়া শয়ন করাইবে; তারপর মৃতের যাবতীয় ঋণ ও দেনা ইত্যাদি শোধ বা মাফ করাইয়া তাহার সন্তান বা অন্য কোন ওলী ব্যক্তি নামাযের ইমামতী করিতে মৃতকে সম্মুখে রাখিয়া তাহার বক্ষ বরাবর দন্ডায়মান হইবেন। লাশের ওলী নিজে ইমামতী না করিলে তাহার অনুমতিক্রমে অন্য কোন পরহেজগার আলেম ব্যক্তি ইমাম নিযুক্ত হইবেন। ইমামের পিছনে মোক্তাদিরা তিন, পাঁচ বা সাত এইরূপ বে-জোড় কাতারে দাঁড়াইবে। এই নামায দাঁড়াইয়া আদায় করিতে হয়, ইহাতে কোন রুকু সিজদা বা বৈঠক ইত্যাদি নাই। এই নামায বসিয়া পড়িলে শুদ্ধ হইবে না।
ইমাম ও মোক্তাগিণ একই সঙ্গে নিয়া কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাইয়া তাকবীরে তাহরীমা বলিয়া হাত বাঁধিবে। ইহার পর ক্রমান্বয়ে আর ও অতিরিক্ত তিনটি তাকবীর বলিতে হইবে, তবে তাহাতে হাত উঠাইতে হইবে না, বরং তাহরিমা বাঁধা অবস্থায় থাকিবে। তাকবীর ইমাম এক শব্দ করিয়া উচ্চারণ করিবেন আর মোক্তাদিরা চুপে চুপে বলিবে।
অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি বলিবার নিয়ম এইরূপ প্রথম অর্থাৎ তাকবীরে তাহরীমার পরে প্রত্যেকে (চুপে চুপে) ছানা পাঠ করিবে। তারপর ২য় তাকবীর বলিয়া (চুপে চুপে) দুরুদ পাঠ করিবে তৃতীয় তাকবীর বলিয়া দরূদ পটিত হয়। তারপর তাকবীর বলিয়া সালাম ফিরাইয়া নামাজ শেষ করিবে।
কাফন পড়াইবার নিয়ম
পুরুষের লাশ হইলে একখানা খাট বা তক্তার উপরে প্রথমে চাদর তারপর ক্রমান্বয়ে ইযার ও পিরহান বিছাইবে। তারপর কাফনের উপরে লাশ শোয়াইয়া উহার নাক, ললাট ও ছিনা ইত্যাদি স্থানে কিছু খুশবু লাগইয়া প্রথমে পিরহান লেপটাইবে। এই ভাবে চাঁদরও লেপটাইয়া দিবে।
স্ত্রীলোকের লাশ হইলে প্রথমে ছিনাবন্দ বিছাইবে তারপর ক্রমান্বয়ে লেফাফা, ইযার ও পিরহান বিছাইবে। তারপর লাশ শয়ন করাইয়া পুরুষের ন্যায় খুশবু লাগাইয়া প্রথমে পিরহান পরাইবে। তারপর মাথার চুল দুই ভাগ করিয়া কাঁধের দুই দিক দিয়া আনিয়া বুকের উপর রাখিবে এবং ওড়না মাথায় জড়াইয়া উহা দ্বারা ছিনার উপরের চুলও ঢাকিয়া দিবে। তারপর প্রথমে বামদিক হইতে এবং পরে ডান দিক হইতে ক্রমান্বয়ে ইযার, লেফাফা ও ছিনাবন্দ পরাইয়া দিবে। কাফন পরান হইয়া গেলে একটু পেঁচাইয়া মাথার উপরে ও পায়ের নীচে নেকড়া কিংবা সূতা দ্বারা হালকাভাবে বাঁধিয়া দিবে।
কাফন পরাইয়া তাহার উপরে কিছু আতর বা অন্য কোন সুঘ্রাণ জাতীয় জিনিস মাখিয়া দিবে। ধর্মযুদ্ধে শহীদ ব্যক্তিকে যেমন গোসল কারাইবার দরকার হয় না, তেমন তাহাদের কাফন পরানোর প্রয়োজন হয় না, বরং তাহাদের পরিহিত রক্তমাখা কাপড়েই তাহাদিগকে দাফন করিবে। লাশ দাফন করিবার পর যদি কবর হইতে কোন জন্তু উহা বাহির করিয়া ফেলে বা অন্য কোন ভাবে বাহির হইয়া পড়ে এবং দেখা যায় যে, লাশের কাপড় বিনষ্ট বা অপহৃত হইয়াছে, তখন লাশ পঁচিয়া গলিয়া গিয়া না থাকলে আবার নতুন ভাবে কাফন পরাইয়া দিবে। আর যদি ইহা পঁচিয়া গলিয়া যাইয়া থাকে তবে একখানা কাপড় দ্বারা পেঁচাইয়া দিবে।
কাফনের কাপড়
মৃত লাশকে যে কাপড় পরিধান করাইয়া সমাধিস্থ করা হয় তাহাকে কাফন বলে। লাশকে কাফন দেওয়া ফরযে কেফায়া। পুরুষ এবং স্ত্রী লাশের কাফন দেওয়ার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রহিয়াছে। যথাঃ পুরুষের জন্য মোট তিনখানা কাপড় ব্যবহার করিতে হয়।
১) লেফাফা বা চাদর ২) পিরহান ৩) ইযার বা তহবন্দ। ইহা পুরুষের জন্য সুন্নত কাফন । পুরুষের জন্য কেফায়া কাফন দুইখানা; যথা ঃ ১) চাদর। ২) ইযার। অর্থাৎ এই দুইখানা কাফন পরাইলেই ফরযে কেফায়া আদায় হইয়া যায়। ওজর বশত ঃ কাপড় না মিলিলে পুরুষকে শুধু একখানা কাপড় অর্থাৎইযার পড়াইয়াও দাফন করা যায়। ইহাকে পুরুষের জরুরত কাফন বলে।
স্ত্রীলোকের জন্য সুন্নত কাফন পাঁচখানা। তাহার প্রথম তিনখানা পুরুষের মত আর অতিরিক্ত দুইখানা ১) ছিনাবন্দ এবং ২) ওড়না। স্ত্রীলোকের জন্য কেফায়া কাফন তিনখানা যথাঃ ১) চাদর ২) পিরহান এবং ৩) ইযার।
স্ত্রীলোকের জরুরত কাপড় দুইখানা। ১) চাদর (লেফাফা) এবং ২) ইযার। লেফাফা মাথা হইতে পায়ের সৃদ্ধাঙ্গুলীর চেয়ে কিছু বেশী লম্বা করিবে। পিরহান ঘাড় হইতে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত লম্বা করিবে। স্ত্রীলোকের ছিনাবন্দ হাঁটু পর্যন্ত চওড়া করিবে এবং ওড়না দুই হাত দৈর্ঘ্য ও এক হাত প্রস্থ্য রাখিবে।
মৃতের গোসলের বিবরণ
মাইয়্যেতকে একখানা টিন, তক্তা অথবা চৌকির উপরে শোয়াইয়া একখানা কাপড় দ্বারা নাভী পাঁটু পর্যন্ত ঢাকিয়া দিবে। শরীরের অন্যান্য কাপড় চোপড় খুলিয়া লইবে। তারপর বড়ই পাতা এবং কর্পুর মেশানোর গরম পানি বা শুধু কর্পুর মিশানোর গরম পানি দ্বারা গোসল করাতে আরম্ভ করিব। গোসল করাইবার সময় পর্দার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিবে। একটি মশারী খাটাইয়া তার মধ্যে লাশ রাখিয়া সর্ব সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে গোসল কারাইবে। মৃতকে গোসলের সময় উত্তর শিয়রি করিয়া লইবে। তারপর গোসল দাতা হাতে একখানা নেকড়া জড়াইয়া সর্ব প্রথম মৃতের গুপ্তস্থানসমূহ ধৌত করাইবে এবং আস্তে আস্তে পেট মর্দ্দন করিবে। ইহাতে নাভী হইতে বা মল মুত্র পথে কোন নাপাক বস্তু বাহির হইলে তাহা ধুইয়া ফেলিবে। তারপর মৃতকে অযু করাইবে (মৃত পাগল বা নাবালেগ হইলে অযু করাইতে হয় না)। অযুতে কুলি করাইতে বা নাকের মধ্যে পানি পেঁৗছাতে হয় না। তার পরিবর্তে ভিজা নেকড়া দ্বারা মুখ ও নাসিকার অভ্যন্তর মুছিয়া ফেলিবে। তারপর লাশকে বামদিকের কাত করিয়া প্রথমে ডান দিক ধৌত করিবে। তারপর ডানদিকে কাত করিয়া বাম দিক ধুইয়া ফেলিবে। গোসল শেষ করিযা শুস্ক কাপড় দ্বারা সর্ব শরীর ভালরূপে মুছিয়া দিবে।
মাইয়্যেতের গোসল সম্পকর্ীয় নিম্নোক্ত মাছআলাসমূহ অবশ্যই মনে রাখা উচিত।
১) যে ব্যক্তি মাইয়্যেতকে গোসল করাইবে তাহার নিজের ও গোসলের পূর্বে অযু করিয়া লওয়া এবং গোসল করানোর পরে গোসল করা উচিত।
২) মৃত ব্যক্তি পুরুষ হইলে তাহাকে পুরুষ এবং স্ত্রী হইলে তাহাকে স্ত্রী লোকে গোসল করাইবে ।
৩) গোসল করতে পুরুষের জন্য পুরুষ লোক এবং স্ত্রীলোকের জন্য স্ত্রীলোক না পাওয়া গেলে মাহরুম লোক (জীতিতাবস্তায় যাহার সাথে বিবাহ জায়েয ছিল না) মাইয়্যেতকে তৈয়ম্মুম করাইয়া দিবে, গোসলের প্রয়োজন হইবে না।
৪) মাহরুম লোকের অভাব হইলে অন্য কোন ব্যক্তির হাতে কাপড় পেঁচাইয়া তৈয়ম্মুম করাইয়া দিবে।
৫) লোকাভাবে স্ত্রী স্বামীকে গোসল করাইতে পারিবে, কিন্তু স্বামী স্ত্রীলোকে গোসল করাতে পারবে না।
৬) অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক বালিকাদিগকে স্ত্রী-পুরুষ যে কেহ গোসল করাইতে পারে।
৭) সন্তান ভুমিষ্ট হইয়া মূহুর্তমাত্র জীবিত থাকিয়া মরিয়া গেলে তাহাকেও গোসল করাইতে হইবে, অবশ্য অজু করাইতে হইবে না। আর মাতৃগর্ভ হইতে মৃত ভুমিষ্ট হইলে তাহাকে গোসল করাইতে হইবে না।
৮) কেহ পানিতে ডুবিয়া মরিলে তাহাকেও গোসল করাইতে হইবে। অবশ্য পানি হইতে উঠাইবার সময় গোসলের নিয়তে তিন বার নাড়িয়া চাড়িয়া উঠাইলে গোসল আদায় হইয়া যায়।
৯) ধর্ম যুদ্ধে শহীদ ব্যক্তিকে গোসল করাইতে হয় না।
১০) সমস্ত শরীর একবারে পানি বহাইয়া গোসল করান ওয়াজিব, কিন্তু তিন তিনবার করিয়া সমস্ত শরীরে পানি ঢালিয়া ধৌত করা মুস্তাহাব।
মৃত ব্যাক্তির ওয়ারিশের ফরযসামুহ
মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তাহার ওয়াশিদের উপর চারটি কাজ ফরয হইয়া পড়ে।(ফরযে কেয়ায়া) যথাঃ
১) মৃতকে গোসল দেওয়া।
২) কাফন পড়ানো।
৩) জানাযা নামায পড়া।
৪) দাফন করা।
কালেমা তাইয়্যেবা
لاَ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ مُحَمَّدُ رَّسُوْ لُ الله
উচ্চারণ ঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ।
অনুবাদ ঃ আল্লাহ ভিন্ন ইবাদত বন্দেগীর উপযুক্ত আর কেহই নাই । হযরত মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তাঁহার প্রেরিত রসূল ।
কালেমা শাহাদত
اَشْهَدُ اَنْ لاَّ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَه‘ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه‘ وَرَسُوْلُه‘
উচ্চারন ঃ আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাছুলুহু ।
অনুবাদ ঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে , অল্লাহ ভিন্ন আর কেহই ইবাদতের উপযুক্ত নাই তিনি এক তাঁহার কোন অংশীদার নাই ।আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং তাঁহার প্রেরিত নবী ।
কালেমা তাওহীদ
لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ وَاحِدَ لاَّثَانِىَ لَكَ مُحَمَّدُرَّ سُوْلُ اللهِ اِمَامُ الْمُتَّقِيْنَ رَسُوْ لُرَبِّ الْعَلَمِيْنَ
উচ্চারণ ঃ লা-ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহেদাল্লা ছানীয়ালাকা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা ইমামুল মোত্তাকীনা রাছুলুরাবি্বল আলামীন ।
অনুবাদ ঃ আল্লাহ ভিন্ন কেহ এবাদতের যোগ্য নাই । তিনি এক তাঁহার অংশীদার নাই মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সোত্তাকীনদের (ধর্মভীরুগণের) ইমাম এবং বিশ্বপালকের প্রেরিত ।
কালেমা তামজীদ
لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ نُوْرَ يَّهْدِىَ اللهُ لِنُوْرِهِ مَنْ يَّشَاءُ مُحَمَّدُ رَّسَوْ لُ اللهِ اِمَامُ الْمُرْسَلِيْنَ خَا تَمُ النَّبِيِّنَ
উচ্চারন ঃ লা-ইলাহা ইল্লা আনতা নুরাইইয়াহ দিয়াল্লাহু লিনুরিহী মাইয়্যাশাউ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহি ইমামূল মুরছালীনা খাতামুন-নাবিয়্যীন ।
অনুবাদ ঃ হে খোদা! তুমি ব্যতীত কেহই উপাস্য নাই, তুমি জ্যোতিময় । তুমি যাহাকে ইচ্ছা আপন জ্যোতিঃ প্রদর্শন কর । মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত পয়গম্বরগণের ইমাম এবং শেষ নবী।
ঈমানের আসল বস্তু তাওহীদ। এক কথায় তাওহীদ শব্দের অর্থ একাত্ব-বাদ । কিন্তু ইহার ব্যাপক ও ব্যবহারিক অর্থ কয়েক প্রকারে বিভক্ত । প্রথমতঃ ইহার অর্থ আল্লাহপাকের সর্বত ভাবে এক জানা, কাহাকেও তাঁহার সমকক্ষ মনে না করা । তাঁহার সাথে কাহাকেও চিন্তায়, কল্পনায় বা কর্মে অংশীদার স্থাপন না করা এবং ‘আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই’ এই কথার উপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিয়া একমাত্র তাঁহারই উপর উপাসনায় রত হওয়া ।
এই সম্পর্কে আল্লাহপাকের একটি পবিত্র কালাম এই যে
وَمَا اُمِرُوْا اِلاَّلِيَعْبُدُ اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَاءَ-
অর্থৎ-তাহাদিগকে অন্য সব দেব-দেবীর পূজা ছাড়িয়া (খালেছ ভাবে) শুধুমাত্র এক আল্লাহ পাকের এবাদত করার জন্য আদেশ করা হইয়াছে।
কালেমা রদ্দেকুফর
اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنْ اَنْ اُشْرِكَ بِكَ شَيْئً وَاَنَا اعَلَمُ بِهِ وَاَسْتَغْفِرُكَ لِمَا اعَلَمُ بِهِ وَمَا لاَاعَلَمُ بِهِ تُبْتُ عَنْهُ وَتَبَرَّأتُ مِنَ الْكُفْرِ وَالشِّرْكِ وَالْمَعَاصِىْ كُلِّهَا وَاَسْلَمْتُ وَاَمَنْتُ وَاَقُوْلُ اَنْ لاَّاِلَهَ اِلاَّاللهُ مُحَمَّدُ رَّسَوْلُ اللهِ –
উচ্চারণ ঃ আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইআও ওয়া আনা আলামু বিহি ওয়া আসতাগ ফিরুকা লিমা আলামু বিহি ওয়ামা লা আলামু বিহি তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্শির্কি ওয়াল মা আছি কুল্লিহা ওয়া আসলামতু ওয়া আমানতু ওয়া আক্বলু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদু রাসূলুল্লাহ ।
অনুবাদ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশা করছি, যেন কাহাকেও তোমান সহিত অংশীদার না করি । আমার জানা-অজানা গুনাহ হতে ক্ষমা চহিতেছি এবং ইহা হতে তওবা করিতেছি । কুফর, শিরক এবং অন্যান্য সমস্ত গুনাহ হতে বিদুরীত হইতেছি এবং প্রতিজ্ঞা করিতেছি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁহার রাসুল ।
ইসলাম
اِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللهِ اْلاِسْلاَمِ
অনুবাদ ঃ আল্লাহপাকের নিকট ইসলাম একমাত্র মনোনীত ধর্ম। ইহা কোরআনের শিক্ষা ও রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম) এর আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম কথাটির একটি অর্থ আত্নসমর্পণ এবং ইহার আর একটি অর্থ শান্তি। এই দুইটি অর্থের মধ্যে পরম্পরের বেশ সংযোগ ও সামঞ্জস্য রহিয়াছে। ইসলামের বিস্তারিত অর্থের ভিতর দিয়া তাহা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে। উহার বিস্তারিত অর্থ এই যে, আল্লাহপাক বিশ্ব মানবকে সরল পথে পরিচালিত করিবার জন্য তাঁহার প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে যে ধর্ম প্রচার করিতে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন তাহার নামই ইসলাম। ইসলামের বিধান সমূহ এতই সুন্দর ও যুক্তিপূর্ন যে, ইহার বিধিনির্দেশগুলি সুষ্ঠুরূপে পালন করিলে মানুষ্য জীবন সার্থক হয়। ন্যায়, পবিত্রতা এবং বন্দেগীর অনাবিল আনন্দে মন প্রাণ ভরিয়া উঠে, দুনিয়া সুখ ও শান্তির ভান্ডারে পরিণত হয়, পরকালে আল-াহপাকের শ্রেষ্ঠ নেয়ামত বেহেশতে প্রাপ্তি ঘটে।
ইসলাম ধর্মের ভিত্তি মোট পাঁচটি, যথা-
১) ঈমান (কালেমা) ২) নামায ৩) রোযা ৪) হজ্জ ৫) যাকাত।
সর্বাবস্থায় জিকির করুন
হযরত আয়েশা (রা•) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা’য়ালার যিকিরে মশগুল থাকতেন। ( আবু দাউদ ,হাদীস নং-১৮)।
আল্লাহতাআলার যিকিরের ফজিলত
জিকির শব্দের অর্থ যেহেতু স্মরণ করা, উচ্চারণ করা নয় তাই আল্লাহর জিকির ঠিকভাবে করতে হলে উপরোক্ত যে কোন একটি বাক্যের দ্বারা মনে মনে উচ্চারণ করতে হবে।
হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রঃ) এর মতে “মুমিনের এক মুহুর্তের জন্য আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরুপ হওয়া বেআদবীর শামিল।”
রসুল পাক (সঃ) কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে কোন বান্দা সবচেয়ে শ্রেষ্ট ও উচু মর্যাদার আধিকারী হবে ? জবাবে রসুলে পাক বললেন আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণকারী নারী ও পুরুষ গন। তখন আবার প্রশ্ন করা হলো আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারী অপেক্ষাও কি? জবাবে রসুল পাক (সঃ) বললেন হ্যা সে যদি তার তরবারী দ্বারা কাফের ও মুশরেকদেরকে এমন ভাবে কাটে যে , তার তরবারী ভেঙ্গে যায় আর সে নিজে রক্তে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তবওু তার চেয়ে আল্লাহর যিকিরকারী মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। (আহমদ, তিরমিজি, বাইহাকী,মিশকত)।
রসুল পাক (সঃ) বলছেন :আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি দ্বাতা আল্লাহর যিকিরের চেয়ে আর কোন জিনিস নাই। (বইহাকী, মিশকাত) রসুল পাক (সঃ) বলেছেন আমি কি তমাদিগকে এমন একটা আমলের কথা বলবোনা যা সকল আমল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তোমাদের মর্যাদাকে সবচেয়ে উচুকারী, সণ্বর্ ও রুপাদান করার চাইতেও শ্রেষ্ঠ এবং জিহাদে শত্রুদের সম্মুখীন হওয়া যে,তোমরা তাদেরকে মারবে আর তারা তোমাদের মারবে এভাবে জেহাদ করার চাইতেও উত্তম? তখন সাহাবা (সঃ) গন উত্তরে বললেন হ্যা অবশ্যই বলুন। তখন রাসুল (সঃ) বললেন : তা হলো আল্লাহর জিকির (আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, ইবনে আবিদ, দুনিয়া, হাকেম, বাইহাকী, জামে সগীর, মিশকাত শরীফ।)
হযরত মায়াজ ইবনে আনাস (সঃ) থেকে বর্ণিত আছে জনৈক ব্যক্তি রসুল পাক (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন মুজাহিদ গণের মাঝে সর্বাধিক প্রতিদান ও সওয়াবের অধিকারী কোন ব্যক্তি হবে? রসুল পাক (সঃ) বললেন : যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ম্মরণ করে অথার্ৎ জিকির করে। অতপর জ্ঞাসা করা হলো রোজাদার গণের মধ্যে সর্বোচ্চ সওয়াবের অধিকারী কে হবে?তিনি (সঃ) বললেন যে রোজাদার আল্লাহর জিকির সবচেয়ে বেশী করবে। এরুপ ভাবে নামাজ, যাকাত, হজ্ব ,সদকা প্রভৃতি সম্পর্কেও জিঙ্গাসা করলো। তিনি প্রতিবার একই উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির সবচেয়ে বেশী করবে সেই সর্বোচ্চ প্রতিদান লাভ করবে।যাবতীয় ইবাদত সমুহের মধ্যে জিকির বা আল্লাহর স্মরনই একমাএ একটি এবাদৎ যা কমকষ্টে সহজ পব্দতিতে করা যায় এবং অল্প আমলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। অজু অবস্থায়, অজু ছাড়া,বসা,দাড়ানো এবং শোয়া অবস্থায় এই এবাদৎ করতে কোন বাধা নেই।
পবিত্র কোরঅনে সুরা বাকারায় আল্লাহ পাক বলেন – তোমরা আমাকে স্বরন করো আমিও তোমাদেরকে স্বরন করবো -১৫২”। বান্দা যদি আল্লাহকে স্বরন করে তবে আল্লাহও বান্দাকে স্বরন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।হযরত সাবেত বুনানী (রাঃ) বলেন , আল্লাহ পাক কখন আমাকে স্বরন করেন তা আমি জানি।লোকেরা আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমি যখন আল্লাহকে স্মরন করি ঠিক তখনই তিনি আমাকে স্মরন করেন।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন ,আল্লাহপাক জিকির ব্যতিত কোন ফরজই আরোপ করেননি যার পরিসীমা বা পরিধি নির্ধারিত নেই, নামাজ দিনে পাঁচবার রমজানের রোজা নিদৃষ্ট সময়ের জন্যে, যাকাতও বৎসরে একবার দিলেই হয় কিন্তুআল্লাহর জিকির বা স্ম্বরন এমন একটা এবাদত যার কোন সীমা সংখ্যা নির্ধারিত নেই, বিশেষ কোন সময়কালও নির্ধারিত নেই অথবা এর জন্য নো, বসা বা শায়িত অবস্থায় থাকারও কোন কথা নেই। এমন কি অজু ও পবিত্র অবস্থায় থাকারও কোন শর্ত নেই। সফরে থাকুক বা বাড়িতে থাকুক, সুস্থ থাকুক বা অসুস্হ্থ থাকুক, জলভাগ কিংবা স্থলভাগ, রাত হোক বা দিন সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণের হুকুম রয়েছে। এজন্য জিকির বা আল্লাহর স্মরণ বর্জনকারীর কোন কৈফিয়ত গ্রহন যোগ্য হবে না। যদি না সে অনুভূতি বিহিন ও বেহুশ হয়ে পড়ে।
হযরত মুয়াজ ইবণে যাবাল (রঃ) বলেন , বেহেশতীরা বেহেস্তে অবস্থান কালে কোন বিষয়ই আফসোস করবেনা, শুধুমাত্র পৃথিবীতে অবস্থান কালে যে সময়টুকু আল্লাহর জিকির করে নাই সে সময় টুকুর জন্যই আফসোস করবে।রসুলপাক (সঃ) বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতের বাগিচায় পায়চারী করতে চায় , সে যেন অধিক পরিমানে আলা্লহর স্মরণ করে। হাদিসে কুদসিতে আছে , “আল্লাহপাক বলেন , যদি আমার বান্দা আমাকে অন্তরে স্মরণ করে , আমিও তাকে স্মরণ করি। অনুরুপ ভাবে বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘৎ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে একহাত অগ্রসর হই।বান্দা যদি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয় আমি তার উভয় বাহু বিস্তৃত পরিমান তার দিকে অগ্রসর হই। যদি সে আমার দিকে হেটে অগ্রসর হয় , আমি তার দিকে দৌড়িয়ে যাই”।হযরত আবু হুরাইরা (রঃ) বলেন দুনিয়ার যে ঘর গুলোতে আল্লাহর জিকির হতে থাকে সে ঘর গুলো উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় চমকাতে থাকে।ফেরেস্তারা আসমান থেকে তা অবলোকন করতে থাকেন।রসুল পাক (সঃ) ইরশাদ করেন কোন মানব দল কোথাও বসে আল্লাহর জিকির করলে ফেরেস্তারা তাদের ঘিরে নেয় এবং তাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।
অধিকন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ফেরেস্তাদের নিকটে তাদের স্মরণ করেন। অযুতে বা বিনা অযুতে উঠতে বসতে চলতে ফিরতে সব সময় আল্লাহর জিকির করা যায়। এর জন্য মানুষের কোন পরিশ্রমই করা লাগেনা। কোন অবসরের প্রয়োজন হয়না। কিন্তু এর সুফল এবং ফলশ্রুতি এত ব্যাপক যে আল্লহর স্মরণের মাধ্যমে পার্থিব কাজ কমর্ও ইবাদতে রুপান্তরিত হয়। আহার গ্রহণের পূর্ববর্তী দোয়া , বাড়িতে ঢোকার ও বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়া , কোন কাজের সূচনা ও পরিসমাপ্তির দোয়া প্রভৃতি দোয়ার তাৎপর্য্য ও সারমর্ম এই যে মোসলমান যেন কোন সময়ে আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী ও গাফেল হয়ে কোন কাজ না করে। কোন বিশেষ সময়েই নয় বরং সর্বক্ষন আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তার কন্ঠ আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকলেই এর মাধ্যমে ইবাদত এবং অন্যান্য দ্বীনি কাজের প্রান প্রতিষ্ঠা হয়। মানুষের মধ্যে যখন এই অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন তার জীবনের ইবাদৎ এবং দ্বীনি কাজ ঠিক তেমনিভাবে বিকাশে লাভ করে যেমন একটি চারা গাছকে তার প্রকৃতির অনুকুল পরিবেশ ও আবহাওয়ায় রোপন করা হয়।
পক্ষান্তরে যে জীবন আল্লহর স্মরণে শূন্য থাকে ,সেখানে বিশেষ সময়ে এবং বিশেষ সুযোগ অনুষ্ঠিত ইবাদত এমন একটি চারা গাছের ন্যায় যাকে তার প্রকৃতির নিছক বাগানের মালিকের বিশেষ তত্ত্বাবাধানে বেঁচে থাকে। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনই আল্লাহর স্মরণবিহীন থাকতে পারে না। প্রাত্যাহিক ঘুমাতে যাওয়ার সময়ের দোয়া ঘুম থেকে উঠে পড়ার দোয়া, অযু করার পূর্বের দোয়া , গোসলের দোয়া, দৈনন্দিন প্রতিটি কাজের শুরুতে দোয়া পড়া। এই ভাবে একজন মুমিন ঘুম থেকে জেগে আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগ মুহুতর্ পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশিত ও রাসুল পাক (সাঃ) এর প্রদর্শিত আমল সমূহ পর্যালোচনা করলে দিনে রাতে ২৪ ঘন্টাই আল্লাহর জিকির অথার্ৎ স্মরণ করতে পারে। বাস্তবে কোন অবৈধ পথ অবলম্বন করতে গেলেই আল্লহর স্মরণ হবে এবং অন্যায় ও অবৈধ কাজ করা থেকে বিরত থাকবে।
সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে আমাদের ক্বলব বা মন পরিষ্কার ও সুস্থ হয়ে যায় । পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বলেন, ” একমাত্র আল্লাহর যিকিরেই (মানুষের) ক্বলব(মন) প্রশান্তি লাভ করে।”
পবিত্র হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে “জেনে রেখ, মানুষের দেহের মধ্যে এক খন্ড মাংশ পিন্ড আছে, যখন তাহা সংশোধিত হয়, তখন সমগ্র দেহ সংশোধিত হয়ে যায়। আর যখন তা দুষিত হয় তখন সমগ্র দেহটাইত দুষিত হয়ে যায়। মনে রেখ ওটাই ক্বলব”( বোখারী ও মুসলিম শরীফ)। অন্য এক হাদিসে পাওয়া যায় মানুষ যখন কোন পাপ কাজ করে তখন তার ক্বলবের মধ্যে কালি পড়ে যায়। আমরা রাসুল পাক (সাঃ) এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই বাল্য কালে উনার দুবার বুক খুলে সীনা পরিস্কার করা হয়েছে। অন্য হাদিসে পাওয়া যায় শয়তান প্রতিটি মানুষের ক্বলবের মধ্যে হাটু গেড়ে বসে থাকে। যখন সে জিকির শুরু করে তখন সে পালিয়ে যায়। আবার যখন আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল হয় তখন শয়তান আবার ক্বলবে ফিরে এসে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রনা) দিতে থাকে।
ক্বলব শব্দের অর্থ অন্তর বা মন।এটি একটি মাংশের টুকরা।এর আকৃতি মসুর ডালের মত।বুদ্ধিকেন্দ্র ও জ্ঞান কেন্দ্র বুঝাতেও কখনও কখনও ক্বলব শব্দটি ব্যবহ্রত হয়।এর স্থান মানুষের বাম স্তনের ১ (এক) ইঞ্চি নীচে। অনেকে ক্বলব কে হৃদপিন্ড মনে করেন। আসলে এটা হৃদপিন্ড বা মস্তিস্ক নয় অন্য জিনিস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিরাও মনে করেন অন্তর বা মন হচ্ছে মানুষের বাম স্তনের নীচে। পবিত্র কোরআনে ক্বলবের অবস্থান সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে, “বস্তুত চক্ষুতো অন্ধ হয় না কিন্তু ঐ ক্বলব অন্ধ হয় যে ক্বলব হলো বুকের মধ্যে”। (সুরা হজ্ব ৪৬)
রাসুল (সাঃ) ফরমান “নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের শরীর বা আকৃতির দিকে তাকান না , বরং তিনি তোমাদের ক্বলবের (মন বা অন্তর) দিকেই তাকান”। অতপর রাসুল (সাঃ) ক্বলবকে দেখানোর জন্য স্বীয় আঙ্গুল দ্বারা নিজের বুকের দিকে ইশারা করলেন (মুসলিম শরীফ) । রসুল পাক(সাঃ) আরো বলেন,”মানুষের ক্বলব আল্লাহ পাকের অতুলনীয় ও আলৌকিক দুই আঙ্গুলের মধ্যে। তিনি অন্তর সমুহকে(ক্বলব) যেমন ইছ্ছা তেমনি করে দেন” । আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় রসুল পাক(সাঃ) বলতেন,”হে অন্তরের(ক্বলব) আবর্তন ও বিবর্তনকারী আল্লাহ ।তুমি আমাদের ক্বলবকে তোমার আনুগত্যমুখী করে দাও।” ক্বলব সম্পর্কে রাসুল পাক (সাঃ) আরো বলেন “ক্বলব হলো সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গেঁর বাদশা” ( মেরকাত শরীফ ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৬২) অর্থাৎ একটি দেশের বাদশাহ ভাল হলে দেশের প্রজারাও যেমন ভাল হতে বাধ্য হয়, তদপ্রু একটি মানুষের ক্বলব বা অন্তর ভাল হলে নিজের কাজ কমর্ও ভাল হয়ে যায়। অপর দিকে একটি মানুষের ক্বলব খারাপ হলে তার কর্মকান্ডও খারাপ হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে ” তাদের ক্বলব সমুহের উপর ছাপ পড়ে গেছে। ফলে তারা বুঝে না।” ( সুরা তওবা, আয়াত-৮৭) । পবিত্র কোরআনে অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে, “আমি তাদের ক্বলব সমুহের উপর ছাপ মেরে দিয়েছি। ফলে তারা শুনতে পায় না”(সুরা আ’রাফ-১০০)।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ক্বলব যতটুকু ভাল তার আমলও তত ভাল আর যার ক্বলব যত নষ্ট ,তার আমলও তত নষ্ট বা খারাপ। পবিত্র কোরআনে আরও এরশাদ হচ্ছে “যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে আল্লাহ তার ক্বলবকে হেদায়াত দান করবেন”। (সুরা আন কাবুত ৯১)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে যে রাসুল, তাদের জন্য দুঃখ করবেন না যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়।যারা মুখে বলে আমরা ঈমান এনেছি, অথচ তাদের ক্বলব ঈমান আনেনি। (সুরা মায়েদা-৪১) । অন্যত্র কালাম পাকে এরশাদ হচ্ছে “কখনো না , বরং তারা যা কিছু (গোনাহ) উপার্জন করে তাই তাদের ক্বলবের উপর মরিচা ধরিয়ে দিচ্ছে”( সুরা মুতাফিফীন-১৩)।
ক্বলবের মধ্যে এই মরিচা পড়তে পড়তে ক্বলব কাল হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। তখন আর ভাল মন্দের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।রাসুল পাক (সাঃ) ফরমান “তখন ভালকে ভাল জানার এবং মন্দকে মন্দ জানার ক্ষমতা রাখেনা” ( মুসলিম শরীফ-১ম খন্ড, ৮২ পৃঃ) ।
তওবা ও এস্তে-গফার করে নেয় তাহলে তার ক্বলব ছাফ হয়ে যায় আর যদি গুনাহ বাড়তে থাকে তাহলে দাগও বাড়তে থাকে ও অবশেষে এটা ক্বলবকে ঘিরে ফেলে” (তিরমিজি শরীফ)। সুতরাং কলব থেকে ময়লা পরিষ্কার করতে হলে কলব সংশোধন করা আবশ্যক। কলব সংশোধন হয়ে গেলে গুনাহ করতে মন চাইবে না। গুনাহর প্রতি ঘৃনা সৃষ্টি হবে। গুনাহ করতে খারাপ লাগবে ও কষ্ট বোধ হবে । অপর দিকে ইসলামের দিকে চলতে মনে ভাল লাগবে ও উৎসাহ বোধ হবে।
ক্বলবের পরিচ্ছনতা বা সুস্থতাকে এরকম ভাবে বোঝানো যেতে পারে। যখন কোন ব্যক্তির জ্বর হয়, তখন তার অবস্থা হয় একজন সুস্থলোকের সম্পুর্ন বিপরীত। অর্থ্যাৎ অসুস্থ্য ব্যাক্তির ঠান্ডা লাগে, ভাল এবং সুস্বাদু খাবার ভাল লাগে না বা তিক্ত লাগে। তদ্রুপ একজন লোকের ক্বলব বা মন যদি অসুস্হ বা ময়লা হয়ে যায়। তখন তারও আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভাল লাগে না। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যে সব কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন সে সকল কাজ করতে মন চায় না। অপর দিকে যে সকল কাজ আল্লাহপাক করতে নিষেধ করেছেন, সে সকল কাজকে খুবই ভাল লাগে। অর্থাৎ একজন ময়লা বা অসুস্হ ক্বলব যুক্ত ব্যাক্তির নামাজ, রোজা, হ্জ্জ, যাকাত, দোয়া, সত্য কথা, বলা ইত্তাদি এসকল কাজ ভাল লাগেনা । অপর দিকে মিথ্যা কথা বলা, ঘুষ খাওয়া, অস্লীলতা, হিংসা ,অহংকার এসকল কাজ খূবই ভাল লাগে বা আনন্দ পায়। অপর দিকে একজন ব্যাক্তির ক্বলব বা অন্তর পরিস্কার বা সুস্হ হলে আল্লাহর আদেশ মানতে অর্থ্যাৎ নামাজ, রোজা, হ্জ্জ, যাকাত ইত্যাদি এবাদতে আনন্দ লাগে। অপর দিকে আল্লাহর নিষেধ কৃত কাজের প্রতি ঘৃনার সৃষ্টি হয় এবং ঐ সকল কাজ করতে মন চায় না।
বিষয়টাকে কোন কোন বুজুর্গব্যক্তি দুধ ও মাখনের সাথে তুলনা করেছেন। যেমন সাধারন দুধ কে যে কোন তরল পদার্থের সাথে রাখলে মিশে যায়। কিন্তু দুধ কে যদি ভাল ভাবে জ্বাল দিয়ে তা থেকে মাখন বের করা হয় তবে এই মাখন কোন তরল পদার্থের সাথে মিশে যায় না। সে তার স্বকীয়তা বজায় রাখবে ।তদ্রুপ একজন মুসলমান যদি সৎ কাজ, আল্লাহর এবাদৎ বন্দেগি ও সর্বাবস্হায় আল্লাহর যিকির বা স্মরনের মাধ্যমে একজন পরিস্কার বা সু্স্হ ক্বলব যুক্ত মুমিন হতে পারে, তবে সে যত প্রতিকুল অবস্থায়ই থাকুন না কেন, সর্বাবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চ্ষ্টো করবে অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ ঠিকভাবে মেনে চলবে এবং গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিবে না। অথবা বষয়টিকে শরীর চর্চার সাথেও তুলনা করা যেতে পারে।একজন সাধারন ব্যক্তিও যদি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতে ব্যয়াম করতে থাকে ,তাহলে দখা যাবে যে কয়েক বৎসরের মধ্যেই সে একজন সাধারন ব্যক্তির তুলনায় অনেক বেশী শক্তিসালী হয়ে গড়ে উঠেছে।
তদ্রুপ একজন সাধারন মুসলমানও যদি অন্যান্য এবাদতের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন সর্বাবস্হায় আল্লাহতাআলার যিকির করতে থাকে তাহলে সেও একজন সাধারন মোসললমানের তুলনায় অনেক বেশী ইমানদার হবে।যানাকি তার চেহারা ও আচার আচরনেও প্রকাশ পাবে । এখন কথা হচ্ছে আমাদের ক্বলব কিভাবে ময়লা ও অসুস্হ হয় এবং কি ভাবে এই ক্বলবকে পরিস্কার ও সুস্থ্য করা যায় এবং প্রকৃত ঈমানদার ও মুসলমান হওয়া যায়। এতক্ষনের আলোচনায় একথা প্রমানিত হলো যে আমদেরর ক্বলব বা মনে জং ধরতে পারে বা ময়লা হতে পারে বা অসুস্হ হতে পারে, আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ না মেনে চললে এবং অ-ইসলামিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে একবার মানুষের মন অসুস্হ ও কলুষিত হলে তখন তার আল্লাহর আদেশ নিষেধের ব্যাপারে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তখন সে তার নফসের খায়েস বা মনের আকাংখা পূরনের জন্যই সব কাজ করে থাকে। সৃষ্টি কর্তা মহান আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ বা বেহেস্তের আনন্দ ও দোযখের শাস্থির কথা মনে থাকে না বা বিশ্বাস করে না। তার সামনে যতই হাদিস বা কোরআনের আয়াত বা কোরআনের কথা বলা হোক না কেন কোন কথাই তার মনে দাগ কাটে না। অর্ধাৎ ধর্মের কথা শুনতে তার খারাপ লাগে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মনের অসুস্থতা ও জং বা ময়লা কিভাবে দুর করা যায় এবং এগুলো আমদের ক্বলব বা মন থেকে দুর করতে পারলে কি উপকার হবে। রাসুল পাক (সঃ) বলেন ”প্রতিটি বস্তু পরিস্কার করার জন্য একটি যন্ত্র বা রেত থাকে । তদ্রুপ মনের পরিচ্ছন্নতা আনার যন্ত্র হচ্ছে আল্লাহর জিকির বা স্বরণ”। রাসুল পাক (সঃ) বলেন “হে আল্লাহ আপনার জিকিরের দ্বারা আমাদের ক্বলবের তালা গুলো খুলে দিন।” রাসুল পাক (সাঃ) আরো বলেন “মানুষ যখন কোন খারাপ কাজ বা গুনাহ করে তখন তার ক্বলবের মধ্যে কালো দাগ পড়ে যায়”। রাসুল পাক (সঃ) আরে বলেন “নিশ্চয়ই ক্বলব সমুহে মরিচা পড়ে। যেমন ভাবে লোহার মধ্যে পানি লাগলে মরিচা পড়ে। তখন সাহাবায়ে কেরাম (রঃ) বললেন হে আল্লাহর রসুল (সাঃ) এটা পরিস্কার করার উপায় কি? জবাবে রাসুল পাক (সঃ) বললেন মৃত্যুকে খুব বেশী বেশী স্মরণ করা আর কোরান তেলওয়াত করা”।
আল্লাহ পাক তখন ইচ্ছা করলে এই ক্বলবের মধ্যেই এক জ্ঞান ন করেন। এই জ্ঞান কোন বই পত্র পড়ে বা শুনে অর্জন করা সম্ভব নয় । এই জন্য এই জ্ঞানকে ক্বলবী জ্ঞান বা আত্বিক জ্ঞান বলা হয় । এই জ্ঞানকে কোন কোন বুজর্গ ইলমে তাসাউফ , ইলমে আসরার বা ইলমে মারেফত প্রভৃতি নামে অভিহিত করে থাকেন।
হাদিস শরীফে আছে জ্ঞান দুই প্রকার । এক প্রকার জ্ঞান হচ্ছে জবানী জ্ঞান, অন্য একটি ক্বলবী এলেম বা আত্বিক জ্ঞান। রাসুল পাক (সাঃ)বলেন ক্বলবী এলেম বা আত্বিক জ্ঞানই হচ্ছে উপকারী জ্ঞান(মেশকাত শরীফ)।।হযরত আবু হোরায়রা(রাঃ) বলেছেন,”আমি রসুল পাক(সাঃ) এর কাছ থেকে জ্ঞানের দুটি পাত্র অর্জন করেছি।একটি তোমাদের মধ্যে বিতরন করেছি অন্যটি করিনি।যদি করতাম তবে আমার তবে আমার কন্ঠদেশ কর্তিত হতো ” (বোখারী শরীফ)।জবানী এলেম হচ্ছে সে সকল বাহ্যিক জ্ঞান যথা কোরআন ও হাদিস শরীফ পড়ে বা শুনে অর্জন করা যায়। কিন্তু ক্বলবী এলেম কোন কিছু পড়ে বা শুনে অর্জন করা সম্ভব নয় । এটা এমন একটা অদৃশ্য জ্ঞান যা শুধু মাএ আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে এবং একমাএ আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত একটি জ্ঞান।এই জ্ঞান অর্জন করতে হলে আমাদের ক্বলব পরিস্কার বা সুস্থ্য থাকা আবশ্যক এবং একমাএ আমাদের ক্বলবের মাধ্যমেই এই জ্ঞান অর্জন সম্ভব। তাই অনেকে এই জ্ঞানকে ক্বলবী জ্ঞান বা আত্বিক জ্ঞান বলে থাকেন। অনেকে ইহাকে ইলমে ছির বা বাতেনী জ্ঞানও বলে থাকেন। এই জ্ঞানকেই কোন কোন সুফী সাধক গন ইলমে তাসাউফ , ইলমে মারেফাত, ইলমে আসরার প্রভৃতি নামে অভিহিত করে থাকেন। পবিএ কালাম পাকে ইহাকে তাজকিয়া এবং হাদিস শরীফে ইহাকে এহসান নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
হুজুর পাক (সাঃ) এর বহুমুখি শিক্ষার মধ্যে এই তাজাকিয়াও ছিল একটি অন্যতম বিষয় ।কালামে পাকে এরশাদ হচ্ছে “তিনিই উম্মিদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরন করেছেন , যিনি তাদেরকে তাজকিয়া করেন এবং কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন। যদিও ইতিপূর্বে তারা গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল” (সুরা জুমায়া ২)।হাদিস শরীফে আছে, যে ব্যক্তি এলেম অনুযায়ী আমল করে আল্লাহ তাকে এমন বস্তুর জ্ঞান দান করেন যা সে ব্যক্তি কখনো জানে নাই বা পড়ে নাই।”এই হদিসের আলোকে বোধ হয় কোন মনীষি বলেছেন _ ”KNOWLEDGE COMES FROM GOD AND EDUCATION IS COLLECTION OF SOME INFORMATION.”অর্থাৎ জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত এবং কিছু সংখ্যক তথ্যের সমাহারকে শিক্ষা বলা হয়। অর্থাৎ বইপএের মাধ্যমে আমরা যে সকল লেখা পড়া শিখেছি তা হচ্ছে শুধুমাত্র কিছু তথ্যের সমাহার । তাই হাদিস শরীফ অনুযায়ী প্রথম প্রকার বাহ্যিক জ্ঞান কে আমরা তথ্য বা INFORMATION বলেতে পারি এবং দ্বিতীয় প্রকার ক্বলবী জ্ঞানকে আমরা ইংরেজীতে KNOWLEDGE বলতে পারি।
হযরত আবু হোরায়রা(রাঃ) বলেছেন,”আমি রসুল পাক(সাঃ) এর কাছ থেকে জ্ঞানের দুটি পাত্র অর্জন করেছি।একটি তোমাদের মধ্যে বিতরন করেছি অন্যটি করিনি।যদি করতাম তবে আমার তবে আমার কন্ঠদেশ কর্তিত হতো ” (বোখারী শরীফ)।ক্বলবী জ্ঞান বা আত্মিক জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি অদৃশ্য জ্ঞান যাহা এলমে শরীয়ত অনুযায়ী চরিত্র গঠন ও নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী লাভ করা যায় অর্থ্যৎ আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি অদৃশ্য জ্ঞান যাহার মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয়, ঈমান,শরীয়ত প্রতিপালনে হৃদয় রাজ্যে নফস ও শয়তানদের প্রভাব ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে কোরআন ও হাদিস শরীফে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সে সকল বিষয় সমুহের তাৎপর্য অন্তদৃষ্টিতে অনুভূত হয় এবং হুজুর পাক (সাঃ) এর উপস্থাপিত দ্বীন প্রতিপালনে মহব্বত ও আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং শীরয়ত বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি ঘৃনার সৃষ্টি হয়। হজরত ইমাম মলিক (রাঃ) বলেছেন ”যিনি তাসাউফ গ্রহন করলেন কিন্তু ফিকহ গ্রহন করলেন না তিনি নিশ্চই কাফের । আর যিনি ফিকহ গ্রহন করলেন কিন্তু তাসাউফ গ্রহন করলেন না, তিনি নিশ্চয়ই ফাসেক। আর যিনি উভয় জ্ঞান গ্রহন করলেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করলেন তিনিই মুহাক্কেক বা প্রকৃত দ্বীন গ্রহণ করলেন।” এই জন্যই একজন বিধর্মি বা ধর্মে বিশ্বাস করেনা এমন ব্যক্তি কোরআন হাদিস বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি ধারী হলেও তাকে আলেম বা মুহাক্কেক বলা যাবে না। কারণ রসুল পাক (সঃ) বলেছেন , আলেমগনই নবী রাসুল গণের উত্তরাধিকারী। তিনি আরো বলেন ফেরেস্তাকুল আলেমদের মহব্বত করেন এমনকি নদীর মৎসকুলও তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করে। রসুল পাক (সঃ) বলেন “আমি আমার উম্মত অপেক্ষা যে রুপ শ্রেষ্ঠ আলেমগনও আবেদ গন অপেক্ষা সেই রুপ শ্রেষ্ঠ”। সুতারং একজন প্রকৃত আলেম বা মুহাক্কেক হতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে ইসলামের দুই প্রকার জ্ঞানই গ্রহন করতে হবে এবং সঠিক নিয়্যতে অথার্ৎ শুধু মাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই সঠিক ভাবে তা আমাদের প্রতিপালন করতে হবে। আমাদের মৃত্যুর পর কবরের ভিতর মুনকারনাকীর দুই ফেরেস্তা যে সকল প্রশ্ন করবেন তার জবাবও শুধুমাত্র এই ক্বলবী জ্ঞানের মাধ্যমেই দেওয়া সম্ভব। তার কারণ হচ্ছে ঐ সকল প্রশ্নের জবাব অনেক বিধর্মী ও নাস্তিকের মস্তিষ্কে মখুস্ত হয়ে আছে।কিন্তু তারা জবাব দিতে পারবে না। কারণ মস্তিষ্ক প্রসুত জ্ঞান বা বাহ্যিক জ্ঞান মানুষের মৃতু্র সংগে সংগেই শেষ হয়ে যাবে। শুধু মাত্র ক্বলবী জ্ঞানই অক্ষত থাকবে এবং ঐ জ্ঞানের মাধ্যমে মুমিনগন জবাব দিতে পারবেন। তাই ক্বলবী জ্ঞান অর্জন করার প্রথম শর্তই হচ্ছে তাকে মুমিন হতে হবে। কবির ভাষায় -
১। ”পুথিগত বিদ্যা ,পর হস্তে ধন ।
নহে বিদ্বা,নহে ধন,হলে প্রয়োজন।” অথবা
২।”যদি কাগজে লিখ নাম, কাগজ ছিড়ে যাবে,
যদি পাথরে লিখ নাম,সে নাম ক্ষয়ে যাবে।
হ্রদয়ে লিখ নাম,সে নাম রয়ে যাবে।”
কাজী সানাউল্লাহ পানি পথী (রঃ) বলেন সুফী বুজুর্গগন যে শাস্ত্রকে লাদুন্নী বলেন তা অর্জন করা ফরজে আইন। কেননা এই শাস্ত্রের ফল হচ্ছে গায়রুল্লাহর যিকির থেকে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, সার্বক্ষনিক উপস্থিতিতে অন্তরের মশগুল হওয়া, কুচরিত্র থেকে আতড়বশুদ্বি যেমন অহমিকা, অহংকার, হিংসা, সংসার প্রীতি, জাকজমক প্রীতি, এবাদতে অলস্যতা, অবৈধ কাম বাসনা, রিয়া, খ্যাতি ইত্যাদি, এর আরোফল হচ্ছে সচ্চরিত্রতার গুনে গুনান্বিত হওয়া, যেমন গোনাহ থেকে তওবা করা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তষ্ট থাকা, নেয়ামতের শোকর গুজার করা বিপদ আপদে ছবর করা ইত্যাদি। এতে সন্দেহ নেই যে এসব বিষয় মুমিনের জন্য অংগ প্রতঙ্গের গোনাহ থেকেও অধিকতর কঠোর হারাম এবং নামায, রোজা, যাকাত অপেক্ষাও অধিক গুরুত্বপূর্ন ফরয। কারণ “যে কোন এবাদত খাঁটি হওয়ার নামই তাসাউফ”। ইমাম গাযযালী (রঃ) বলেন, “ক্বলবী জ্ঞান বা আত্বিক জ্ঞান অর্জন করা ফরজে আইন”। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রঃ) ও তাসাউফ বা ক্বলবী জ্ঞানকে ফরযে আইন সাব্যস্ত করেছেন। আল্লামা শামী (রঃ) বলেন, – “কুস্বভাব দূর করার জন্য ক্বলবী জ্ঞান এতটুকু অর্জন করবে যতটুকুর প্রয়োজন তুমি নিজের জন্য অনুভব করবে।”
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) প্রেমই ঈমানের ভিত্তি
আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ ফরমান:
قُلْ اِنْ كَانَ اَبَاؤُكُمْ وَاَبْنَاؤُكُمْ وَ اِخْوَانُكُمْ وَ اَزْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَاَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَكِنُ تَرْضَوْنَهَا اَحَبَّ اِاَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَ جِهَادٍ فِىْ سَبِيْلِهِ فَتَرَبَّصُوْا حَتَّى يَاْتِىَ اللَّهُ بَاَمْرِهِ وَاللَّهُ لآ يَهْدِىْ الْقَوْمَ الْفَسِقِيْنَ
(হে নবী,তুমি বলে দাও- ওহে লোক সকল, তোমাদের মাতা-পিতা, সন্তান, ভাই, পত্নী, স্বগোষ্ঠী, অর্জিত সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পরার আশংকা কর, এবং তোমাদের পছন্দনীয় বাসস্থান- এসবের কোন একটি যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ, তার রাসুল এবং তার পথে চলার প্রচেষ্ঠা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর শাস্তি আসা পর্যন্ত আপেক্ষা কর।আল্লাহ তা’য়ালা অবাধ্যদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।
আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমান :
لاَ يُوْمِنُ اَحَدُكُمْ حَتَّى اَكُوْنَ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ اَجْمَعِىْنَ
তোমাদের কেউ ততক্ষন পর্যন্ত ইমানদার বলে গন্য হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ থেকে অধিক প্রিয় না হই (বুখারী ও মুসলিম)
সাহাবায়ে কেরামের মতে মিলাদুন্নবী
বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজর মক্কি হায়তমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রনীত কিতাব আন ইন মাতুল কুবরা আলাল আলম ফী মাওলিদি উলদে আদম”
এর মধ্যে কতিপয় হদিস শরীফ রিলক্ষিত হয়।
সর্বশ্রেষ্ট সাহবী ও ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর(রা:)বলেন-
مَنْ اَنْفَقَ دِرْهَمًا عَلَى قِرا ةَ مَوْ لِدِ النَّبىُ مَلَى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَنَرَفِيْقِى فىِ الجَنّةِ
অর্থাৎ ইমলাদুন্নবী উপলেক্ষে যে কমপক্ষে এক দিরহাম খরচ করবে সে বেহেশতের শধ্যে আমার বান্ধু হবে।
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন -
مَنْ عَظَّمَ مَوْلِدِ النَّبِىُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ اَخْيَا الاسْالاَمُ
যে মিলাদুন্নবীকে সম্মান করল সে যেন ইসলামকেই জিন্দা করল
তৃতীয় খলিফা যহরত উসমান বিন আফফান (রাঃ) বলেন -
مَنْ اَنْفَقَ دِرْهَمًا عَلَى قرأة مَوْلِدِ النَّبِىُ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ فَكَا نَّمَا ثَهِيد غَزُوَةِ بَدَر رَوحُنَيْنُ
যে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে কমপক্ষে এক দিরহাম খরচ করবে সে যেন বদর এবং হুনাইনের যুদ্ধে অংশ গ্রহন করল
চুতর্থ খলিফা হযরত আলি মুরতাদ্বার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
مَنْ عَظَّمَ مَوْ لِدِ النَّبِى صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَكَانَ سَبَبَا لِقرا ته لا يَحْرُمُ مِنَ الدُّنْيَا اِلا َّبِالاِ يْمَانِ وَيَدْخُلُ الجَنَّهَ بِغَيْرِ حِسَاب
অর্থাৎ যে ব্যিক্ত মিলাদুন্নাবী সম্মান করবে তার বদৌলেত সে ঈমান ব্যতিরেকে দুনিয়া হতে বিদায় নেবেনা এবং কোন হিসাব নিকাশ ছাড়া বেহেশতে প্রবেশ করবে।
বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
وَدَوتْ لَوْكَانَ لِى مِثل جَبَلٍ اُحٍد زَهْبًا فَا نْفَقُتُهُ عَلَ قِراَ ة مَوْلِدِالنّبِى صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ
অর্থাৎ আমার মন চায়, যদি আমার কাছে উহুদ পাহাড় পরিমান স্বর্ন থাকত, তাহলে সব গুলো মিলাদুন্নবী পালনে খরচ করতাম।
হযরত জুনাঈদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহি আলাহি বলেন-
مَنْ حَضَرَ مَوْلِدِالنَّبِى صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمُ وَعَظّمَ قدره فَقَد فَازَ با لاِ يْما ن
অর্থাৎ যে ব্যক্তি মিলাদুন্নবী মাহফিলে উপস্থিত হয় এবং তার যথাযথ সম্মান করে তাহলে তার ঈমআন সফল হয়েছে।
হাদিসের আলোকে ঈদে মিলদুন্নবী
পবিত্র হাদিসের মধ্যে ও ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের বৈধতার প্রমান পাওয়া যায় । তম্নধ্য হতে কয়েকটি হাদীস হতে একটি হাদীস শরীফ হচ্ছে-
عن ابن عباس رضي الله عنه ،كان يحدث ذات يوم في بيته وقائع و لاد ته بقوم فيبشرون ويحمدون إذا جاء النبي صلي الله عليه و سلم و قال حلت لكم شفاعتي
͏ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত, একদিন হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কিছু লোক নিয়ে নিজ গৃহে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মকালীন ঘটনাবলী বর্ণনা করছিলেন এবং তাঁর প্রশংসাবলী আলোচনা করে দুরুদ ও সালাম পেশ করছিলেন। ইত্যবসরে প্রিয়নবী হাজির হয়ে এ আবস্তা দেখে বললেন, তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত আবশ্যক হয়ে গেল ।
( ইবনে দাহইয়ার আত-তানবীর )
সুতরাং প্রমানিত হল, মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন দ্বারা রাসূলে পাকের শাফায়াত নসীব হয় ।
͏ মিলাদ পালন করেছেন নবীজি নিজেই -
عَنْ اَبِى قَتَدَةَ الاَنْصاَرِى رَضِى الله عَنهُ اَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سءل عَنْ صَوْمِ يَوْم الاِ ثْنَيْنِ قَلَ ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيْهِ بُعِثْتُ اَوْاُنْزِلَ عَلَىَّ فِيْهِ-
অর্থাৎ হযরত আবু কাতাদা (রা:) হতে বর্নিত রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলায়হি ওয়াসাল্লামার দরবারে আরজ করা হলো তিনি প্রতি সোমবার রোজা রাখেন কেন? উত্তরে নবীজি ইরশাদ করেন, এই দিনে আমি জম্মন গ্রহন করেছি, এই দিনেই আমি প্রেরিত হয়েছি এবং এই দিনেই আমার উপর পবিত্র কুরআন নাযিল হয় ।
(সহীহ মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড, ৮১৯ পৃষ্ঠা, বায়হাকী: আহসানুল কুবরা, ৪র্থ খন্ড ২৮৬ পৃ: মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল ৫ম খন্ড ২৯৭ পৃ: মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৪র্থ খন্ড ২৯৬পৃ: হিলিয়াতুল আউলিয়া ৯ম খন্ড ৫২ পৃ:)
͏ আরো মজার ব্যপার হল আবুলাহাব একজন কাফের হওয়ার পরও নবীজীর জন্মেরর দিন খুশি হয়ে সে তার সংবাদ দাতা দাসী সুয়াইবাকে আযাদ করে দেওয়ার কারনে পরকালে কঠিন আযাবের ভিতরে ও প্রতি সোমবার তার আযাব হালকা করে দেওয়া হয়।
(উল্লেখ্য যে আবু লাহাবের ঘটনা সম্পর্ক হাদিসটি আল্লামা ইবনে জাওযী, আল্লামা কুস্তালানী, আল্লামা জালালুদ্দিন মুয়ূতী সহ আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন।
কুরআনের আলোকে মিলাদুন্নবী
এ পৃথিবীতে যত নেয়ামত রয়েছে বা এসেছে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নেয়ামত হচ্ছে রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম । আল্লাহর এ নেয়ামত ও আনুগ্রহকে কেন্দ্র করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও আনন্দ করার নির্দিশ স্বয়ং রাব্বুল আলামীন নিজে দিয়েছেন ।
যেমন এরশাল হচ্ছেঃ-
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَ بِرَحْمَتِهِ فَبِذَالِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَا خَىْرٌ مِمَّا ىَجْمَعُوْنَ
আর্থাৎ হে রাসুল আপনি বলুন আল্লাহর দয়া ও রহমতকে কেন্দ্র করে তরা যেন আনন্দ করে এবং এটা হবে তাদের অর্জিত সকল কর্মফলের চেয়েও শ্রেষ্ট । সুরা ঈউনূছ,আয়াত ৫৮
উল্লেখ্য যে, নবীজীর শুভাগমনের চাইতে শ্রেষ্ট নেয়ামত এবং দয়া বিশ্ববাসীর জন্য আর কি হতে পারে ? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে-
وما ارسلنك إلا رحمة للعالمين
হে রাসূল, নিশ্চই আমি আপনাকে জগতসমুহের রহমত করেই প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ১০৭)
দ্বিতীয় দলীলঃ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমানঃ-
قَالَ عِيْسَى ابْنُ مَرْيَمَ اَللَّهُمَّ رَبَّنَا اَنْزِلْ عَلَيْنَا مَاءِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُوْنُ لَنَا عِيْدًا الِّاَوَّلِنَا وَاَخِرِنَا وَ اَيَةً مِنْكَ وَارْزُقْنَا وَاَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِيْنَ-
আর্থাৎ ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) দুয়া করলেন, হে আল্লাহ ! হে আমাদের প্রভু আমাদের প্রতি আকাশ হতে খাদ্য অবতীর্ন করুন যেন সেটা আমাদের জন্য অর্থাৎ আমাদের মধ্যে যারা প্রথমে ( বর্তমানে আছে ) এবং যারা পরে , সকলের জন্য আনন্দের বিষয় হয় এবং আপনার পক্ষ হতে এক নিদর্শন হয় । আর আপনি আমাদেরকে রিযিক প্রদান করুন বস্তুত আপনিই সর্বোত্তম রিযিক প্রদানকারী ।
(সূরা মায়েদা আয়াত ১১৪)
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা পেলে তা যদি ঈসা (আঃ) এর ভাষায় সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আনন্দোৎসবের কারণ হয় তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত মহান নেয়ামতে আগমন দিবস কতই না মর্যাদাবান , গুরুত্ববহ, ও আনন্দের তা সহজেই আনুমেয়।
মুমিন ব্যক্তির কবর
মুমিনকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন তার কবর সত্তর গজ প্রশস্থ করে দেয়া হয় এবং মখমলের বিছানা বিছিয়ে খোশবু ছিটিয়ে দেয়া হয়।
আর কবরকে ঈমান ও কুরআনের নূর দ্বারা আলোকোজ্জ্বল করে দেয়া হয় এবং তাকে দুলহার মত শুইয়ে দেয়া হয়। এবার তাকে তার মাহবুব (প্রিয়জন)-ই জাগ্রত করবে।
কবরের হুংকার
হাযরত সায়্যিদুনা আবুল হুজ্জাজ সুমালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমায়েছেন, যখন মৃত বাক্তিকে কবরে শায়িত করা হবে, তখন কবর তাকে সম্ভোদন করে বলবে, হে মানুষ! তোমার ধংশ হোক ! তুমি কেন আমার কথা ভুলে গিয়েছিলে? তুমি কি জান না যে, আমি ফতনার গৃহ, আমি অন্দকার গৃহ । তুমি কিসের ভিত্তিতে আমার উপর দিয়ে সদম্ভে চলাফেরা করেছিলে? যদি সে আল্লাহর নেক বান্দা হয় , তাহলে এক গায়েবী আওয়াজ কবরকে সম্ভোধন করে বলবে, হে কবর! তোমার মধ্যে শায়িত বাক্তে যদি সৎ কাজের আদেশ দাতা হয় এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধকারী হয় তবে তার সাথে তুমি কিরূপ আচরণ করবে? উত্তরে কবর বলবে, যদি তাই হয় তাহলে আমি তার জন্য মনোমুগ্ধকর উদ্যানে পরিণত হব । অতঃপর সে ব্যাক্তির শরীর নূরের শরিরে পরিণত হবে এবং তার আত্না আল্লাহর দরবারে উড়ে চলে যাবে । (মুসনদে আবি ইউলা, হাদিস নং -৬৮৩৫)
ক্ববর বেহেস্তের বাগান অথবা গোজখের গর্ত
হযরত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম এরশাদ করেছেন : ক্ববর বেহেস্তের বাগান অথবা দোজখের গর্ত।
অতএব মুত্যুকের বেশী পরিমানে স্মরণ কর, যা তোমাদের জীবনের আশা-আকাংখার উপর বালি ঢেলে দেয়।
দোজখের বিবরণ
গোনাহগার বেঈমানদের সমুচিত শাস্তি দিবার জন্য আল্লাহ পাক যে কঠিন আজাবের স্থান নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন তাহাই দোজখ । ইহা অতিশয় কষ্টের স্থান এবং বিভিন্ন বিভীষিকাময় জিনিষে পরিপূর্ণ। সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ বলিতে সেখানে কিছুই নেই । দোজখ আল্লাহপাকে গজবের আগুণে প্রজ্জ্বলিত । যাহারা আল্লাহপাকের নাফরমানী করিয়া নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হইয়া (তওবা না করিয়া)_ মরিয়া যাইবে, তাহারা আখেরাতে অনন্তকাল দোজখের কঠোর শাস্তি ভোগ করিবে ।পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরীফে দোজখ সমন্ধে যে সকল বিবরণ পাওয়া যায়, তাহা শুনিলে শরীর শিহরিয়া উঠে । দেজখের সমান্যতম আগুণ দুনিয়ায় আনিয়া সাত সমুদ্রের পানিতে ৭০ বার ধৌত করিলে উহার উত্তাপ দুনয়ার আগুন হইতে সহস্রগুণ বেশী থাকিবে ।দুনিয়ার সমস্ত কাষ্ঠ একত্র করিয়া প্রজ্জ্বলিত করিলে যে পরিমাণ উত্তাপ সৃষ্টি হইবে, দোজখের আগুণের উত্তাপ তাহা হইতেও সহস্রগুণ অধিক ।
একদিন হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদিগকে সঙ্গে লইয়া বসিয়া কথোপকথোন করিতেছিলেন, এমন সময়ে তাহারা একটি ভীষণ শব্দ শুনিতে পাইলেন । সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করিলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহা কিসের শব্দ? তদুততরে হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিলেন যে, ৭০ বৎসর আগে দোজখের কিনারা হইতে একখানা পাথর নীচের দিকে পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল, অদ্য ৭০ বৎসর পরে সেই পাথর খানা দোজখের তলায় যাইয়া ঠেকিল, ইহা তাহারই শব্দ । ইহা হইতে দোজখের গভীরতা সম্বন্ধে কিছুটা অনুমান করা যায় ।
আল্লাহপাক তাহার পাক কালাম কোরআন মজিদে ফরমাইয়াছেনঃ
وَقِيْلَ لَهُمْ ذَوقُوْا عَذَابُ النَّا رِالَّذِىْ كُنْتُمْ بِهِ تَكْذِبُوْنَ
-অনুবাদঃ পাপীদিগকে বলা হইবে, তোমরা এখন দোজখের আগুণের স্বাদ গ্রহন কর ।
আল্লাহ ও রাসূলের কথায় বিশ্বাস কর নাই, কোরান ও হাদীসকে মিথ্যা জানিয়াছিলে, দোজখের আজাবকে তখন মিথ্যা জানিয়াছিলে, এখন তাহার শাস্তি ভোগ কর; দেখ কে তোমাদিগকে সাহায্য করিতে আসে ।
হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, দোজখের লোকদিগকে জকুম নামক এক প্রকার বৃক্ষের ফল আহার করিতে দেওয়া হইবে । ইহা এত তিক্ত যে, যদি উহার এক টুকরা দুনিয়ার পানিতে ফেলিয়া দেওয়া হয়, তবে দুনিয়ার সমস্ত পানি তিক্ত হইয়া যাইবে ।এক সময়ে হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর নিকট আগমণ করিলেন, তখন তাহার চোহারা অত্যন্ত খারাপ দেখাইতেছিল । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করায় জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, দোজখের অগি্নভয়ে আমার অন্তকরণ থর থর করিয়া কাঁপিতেছে । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিলেন যে, দোজখীদিগকে যে কাপড় পরিধান করান হইবে, তাহার এক ইঞ্চি পরিমাণ যদি দুনিয়ার এক প্রান্তে লটকাইয়া দেওয়া হয়, তবে তাহার দুর্গন্ধে দুনিয়ার সকল প্রাণী মরিয়া যাইবে । আর দোজখীদিগকে যে জিঞ্জির দ্বারা বন্ধন করা ইহবে, তাহার একতলা পরিমাণ যদি দুনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতের উপর স্থাপন করা যায়, তবে পর্বত ভষ্ম হইয়া সপ্তস্তর জমিন ভেদ করিয়া দোজখের জিঞ্জির দোজখে গিয়া পোঁছবে ।
হযরত আদম (আঃ) যখন প্রথম দুনিয়াতে আগমণ করেন, তখন তাহার খাদ্য পাকাইবার জন্য আগুনের প্রয়োজন হইলে আল্লাহপাকের আদেশে হযরত জিব্রাইল (আঃ) দোজখের দারোগা মালেকের নিকট হইতে এক মটর পরিমাণ আগুন লইয়া সপ্ত সমুদ্রে ৭০ বার ধৌত করিয়া উহা দুনিয়ার পূর্ব প্রান্তে ‘ছাহেফ’ পাহাড়ের উপর রাখিলেন । তখই পাহার আগুনের উত্তাপ সহ্য করিতে না পারিয়া পুড়িয়া ভষ্ম হইয়া গেল । শুধু ধুম রহিয়া গেল, সেই ধুম হইতেই দুনিয়ার অগি্নর সৃষ্টি । দোজখের অগি্নর তেজ এত বেশী হইবার কারণ এই যে, পাথর দ্বারা ইহার ইন্ধন দেওয়া হয় । সকলেই জানেন যে, কাঠের আগুনের চেয়ে পাথরের কয়লার আগুনের তেজ বেশী । আর শুধু খাঁটি পাথর দ্বারা যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত রাখা হইবে, তাহার তেজ আরও অধিক হওয়া স্বাভাবিক ।
দোজখীদিগকে গরম পানি ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ পান করিতে দেওয়া হইবে, যাহাতে তাহাদের নাড়ী-ভূড়ী সব খসিয়া পড়িবে । আর তাহাদের শরীর দুর্গন্ধে ভরিয়া যাইবে । প্রত্যহ তাহাদিগকে ৭০ বার করিয়া জ্বালাইয়া ফেলা হইবে, অতপর সেই মূহুর্তেই আবার পুর্বের মত শরীর হইয়া যাইবে । এদের সম্বন্ধে আল্লাহপাক বলিয়াছেনঃ
لاَيَمُوْ تُفِيْهَاوَلاَيَحْىَ
অনুবাদঃ ‘সেখানে তাহারা মরিবেও না, বাঁচবেও না।’সেখান হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য তাহারা আল্লাপাকের নিকট ও শাস্তি প্রদানকারী ফেরেশতাদের নিকট কত কাকুতি মিনতি করিবে। কিন্তু কেহই তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিবে না; বরং আল্লাহপাক তাহাদিগকে বলিবেনঃ –
فَذُوْقُوْ فَلَنْ نَذِيْدَ كُمْ اِلاَّ عَذَابَ
অনুবাদঃ হে গোণাহগারগণ! তোমরা দোজখের স্বাদ গ্রহণ কর, দোজখের শাস্তি ভোগ করিতে থাক । আমি তোমাদের আজাব শুধু বর্ধিতই করিব । দুনিয়াতে আমার কথা শুন নাই, কোরান হাদিস মান নাই, আজ তাহার ফল ভোগ কর ।
পাপীদিগকে দোজখে নিক্ষেপ করিলে তাহাদের হাত-পা বলিবে যে, দুনিয়ায় যেমন আল্লাহপাকের হুকুন মান নাই, আজ তেমন শাস্তি ভোগ কর । দোজখের উত্তাপে অস্থির হইয়া বৃষ্টি পার্থনা করিলে আকাশে কালো মেঘ দেখা দিবে এবং উহা হইতে অসংখ্য সাপ ও বিচ্ছু দোজখীদের দেহে পতিত হইতে থাকিবে । ঐ সমস্ত সাপ বিচ্ছু একবার দংশন করিলে হাজার বৎসর পর্যন্ত তাহার যন্ত্রণা থকিবে, অথচ অনবরতই উহারা তাহাদিগকে দংশন করিতে থাকিবে ।
দোজখের সাতটি স্তর । উহার একটির নিম্নে অপরটি অবস্থিত । যে স্তর যত বেশী নিম্নে তাহার উত্তাপ ও শাস্তির পরিমাণ তত বেশী । একটি হইতে অপরটির উত্তাপ ৭০ গুণ বেশী ।
প্রথম দোজখের নাম “হাবিয়া” ফেরাউন-নমরুদ প্রভূতি কাফেরগণ এই দোজখে বাস করিবে ।
দ্বিতীয় দোজখের নাম “ছায়িরা” মুশরেকগণ এই দোজখে বাস করিবে ।
তৃতীয় দোজখের নাম “ছাকার” মুর্তিপূজারীগণ এই দোজখে বাস করিবে ।
চতুর্থ দোজখের নাম “জ্বাহীম” শয়তান ও অগি্নপূজারীগণ এই দোজখে বাস করিবে ।
পঞ্চম দোজখের নাম “হুতামা” ইহুদিগণ এই দোজখে বাস করিবে ।
ষষ্ট দোজখের নাম “ওয়াইল” আমাদের আখেরী নবীর উম্মতগণের মধ্যে যাহারা গোনাহের কাজ করিয়া বিনা তওবায় মরিয়া যাইবে, তাহারা এই দোজখে বাস করিবে ।
বেহেশতের বিবরণ
জিন ও মানুষ আল্লাহপাকের হুকুমে কিছু দিনের জন্য দুনিয়ার আগমণ করে । তারপর তাহার আয়ু শেষ হয়ে গেলে আবার সে অন্য জগতে চলিয়া যায় । এবং সেই জগতে তাহা কার্যাবলীর ফল ভোগ করে । ভাল মন্দ উভয় কাজের ফল দানের জন্য আল্লাহপাক উপযুক্তরূপে তাহার ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন । পূন্যবানদের নেক কাজের ফলস্বরূপ বেহেশত এবং পাপীদের বদ কাজের প্রতিফল স্বরূপ দোজখ বহুকাল পূর্বে হইতেই তৈরী রহিয়াছে । বেহেশত পরম সুন্দর এবং চির সুখময় স্থান । ইহা নানা প্রকার ফুল ও ফলে পরিপূর্ণ । সুন্দর প্রাসাদ সমূহের দ্বারা সুশোভিত । ইহাতে অসংখ্য সুমিষ্ট, সূশীতল, সুগন্ধিযুক্ত সরবতের ঝরণা ও নদী প্রবাহিত আছে । ইহা এত সুন্দর যে, মানুষ কখনও ইহা কল্পনাও করিতে পারে না । আল্লাহপাক তাঁর নেককার ও মোমেন বান্দাদের এবাদতের পুরষ্কার স্বরূপ ইহাতে স্থান দিবেন । এখানে জন্ম, মুতু্য, রোগ-শোক অভাব-অভিযোগ ও দুঃখ বলিতে কিছুই থাকিবে না ।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, বেহেশতের মাটি হইবে মেশক জাফরানের । আল্লাহপাক স্বর্ণের ও রৌপ্যের ইট দ্বারা ইহা প্রস্তুত করিয়াছেন । বেহেশতের সুখ ও সৌন্দর্য্যের বর্ণনা করা মানুষের সাধ্যাতীত । বেহেশতবাসী পুরুষগণ ৩০ বৎসরের যুবক এবং স্ত্রীলোকগণ ১৬ বৎসরের পূর্ণ যুবতী হইবে । হুরগনও সকলে পূর্ণ যুবতী সদৃশ্য হইবে । আল্লাহপাক হুরদিগের এত সৌন্দর্য দান করিয়াছেন যে তাহা বর্ণনা করার ভাষা মানুষের নাই । যদি কোন হুর রাত্রির দিকে নজর করত, সে রাত্রি দিন হইয়া যাই, তাহাদের মুখের থুথু এত সুগন্ধিপূর্ণ হইবে যে তাহার একফোটা পানিতে পতিত হইলে সমস্ত পানি দুধের মত সাদা ও আতরের মত সুগন্ধিময় হইয়া যাইবে । দুনিয়ার নিয়ম এই যে মানুষের বয়স যত বেশী হয় ততই তাহারা দুর্বল হইয়া পড়ে, কিন্তু বেহেশতবাসী গণের বয়স যতই বেশী হইবে, ততই তাহাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে । বেহেশতের জনৈকা বাদীকে দেখিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) বেহুস হইয়া পড়িয়া গিয়াছিলেন । সেই বাদী বলিয়াছিলেন যে আমরা যাহাদের দাসী তাহাদিগকে আল্লাহপাক হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর উম্মত হিসেবে সৃষ্টি করিয়াছেন । আল্লপাকের মহব্বতে যাহারা নিজেকে বিসর্জন দিয়াছেন তাহারাই এই চির সুখময় বেহেশতের অধিকারী হইবে । যাহারা আল্লাহপাকের মহব্বতে আপন শির কোরবান করিয়াছেন, তাহারাই বেহেশতের ফল খাইবার অধিকারী হইবে । যাহারা সবসময় আল্লাহপাকের জেকেরে লিপ্ত আছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানে রোজা রাখে, রাত্রিকালে নির্জনে, নিরালায় আল্লাহপাকের ভয়ে অথবা আল্লাহপাকের মহব্বতে রোদন করে, আপন গোনাহর জন্য অনুতপ্ত হইয়া ক্রন্দন করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহারাই চির সুখময় বেহেশতের অধিকারী হইবে ।
আল্লাহপাক বেহেশতীদিগকে উন্নতমানের পোষাক পরিধান করাইবেণ প্রত্যেক পোষাকের ভিন্ন ভিন্ন রঙ হইবে । বেহেশতবাসীদের দশ আঙ্গুলে দশটি আংটি থাকিবে, উহার প্রত্যেকটিতে বিভিন্ন লেখা অংকিত থাকিবে।
প্রথম আংটিতে লেখা থাকিবে, “তোমাদের উপর ছালাম ।
দ্বিতীয়টিতে লেখা থাকিবে, “তোমরা বেহেশতে সবসময় আল্লাহপাকের দিদার লাভ করিবে ।
তৃতীয়টিতে লেখা থকিবে, “যাহারা আল্লাহর ইবাদত করিয়াছে তাহারা অনন্তকাল বেহেশতে বাস করিবে ।
চুতুর্থটিতে লেখা থকিবে, “আল্লাহপাক তোমাদের উপর সন্তুষ্ট ।
পঞ্চমটিতে লেখা থকিবে, “হুরগণ সবসময় তোমাদের খিদমতে নিয়োজিত থাকবে ।
সপ্তমটিতে লেখা থকিবে, “তোমাদের ইচ্ছামত হুরগণ, নবী অলি ও সিদ্দিকগণের সহিত বসবাস করিতে থাক ।
নবমটিতে লেখা থকিবে, “তোমাদের যৌবন কখন লোপ পাইবে না ।
দশটিতে লেখা থাকিবে, “পরশীগণ তোমাদিগকে কষ্ট দিবে না ।
হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, আল্লাহপাক বলিয়াছেন যে আমার নেক বান্দাদিগের জন্য এমন নেয়ামত তৈরী করিয়া রাখিয়াছি, যাহা কোন চুখ দেখে নাই, কোন কর্ণ তাহা শুনে নাই, কোন মানব তাহা কল্পনাও করে নাই ।
বেহেশতের দালানসমূহের একখানা সোনার ইটের সহিত মেসক দ্বারা আর একখানা রূপার ইটের সহিত জোরা দেওয়া হইয়াছে । উহার কঙ্কর সমূহ মতি ও ইয়াকুতের তৈরী । যাহারা বেহেশতে যাইবে তাহাদের আর কোন দঃখ-কষ্টই থকিবে না । তাহাদের পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন হইবে না, তাহাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ময়লা হইবে না, কোন রোগ-শোক, ভাবনা-চিন্তা তাহাদিগকে স্পর্শ করিবে না । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, বেহেশতের মধ্যে দুইটি বাগান হইবে, যাহার আসবাব-পত্র স্বর্ণের হইবে ।
বেহেশতের দালানগুলির একশতটি করিয়া তলা হইবে । যাহার একতলা হইতে অপর তলার দূরত্ব আসমান ও জমীনের দুরত্বের সমান হইবে । বেহেশতের মধ্যে সর্বাপো বড় বেহেশত হইতেছে “জান্নাতুল ফেরদাউস ।” জান্নাতুল ফেরদাউস হইতে চারটি ঝরণা প্রবাহিত হইতেছে । উহার একটি দুধের, একটি মধুর, একটি পবিত্র শরাবের এবং আর একটি স্বচ্ছ পানির । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন যে, তোমরা যদি আল্লাহ-পাকের নিকট বেহেশত চাও-তবে জান্নাতুল ফেরদাউস চাহিও ।
হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন যে, যাহারা প্রথম বেহেশতে যাইবে তাহাদের চেহারা পূর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় উজ্জল হইবে । তাহার পরে যাহারা যাইবে, তাহাদের উজ্জলতা একটু কম হইবে । এইরূপ উজ্জলতা ক্রমশঃকম হইতে থাকিবে । বেহেশতীদের ঘর্ম ও থুথু হইতে মেসক ও জাফরানের সুগন্ধি নির্গত হইবে ।
বেহেশতের সুখ-সম্পদ ও সৌন্দর্য্যের পূর্ণ বর্ণনা করিবার ক্ষমতা মানুষের নাই, ইহা বেহেশতের অতি সামান্য পরিচয় মাত্র ।
বেহেশত আটটি । যথাঃ
জান্নাতুল খোলদ ।
দারুস সালাম ।
দারুল কারার ।
জান্নাতুল আদন ।
জান্নাতুল মাওয়া ।
জান্নাতুন্নায়ীম ।
জান্নাতুল ইলু্যয়্যি ।
জান্নাতুল ফেরদাউস
জান্নাতের হুর লু’বা
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন : জান্নাতে এক হুর আছে, যার নাম লু’বা। তাঁকে চারটি জিনিস দিয়ে বানানো হয়েছে মেশক, আস্বর, কাফুর ও জাফরান। আবার এমন জিনিসকে “মায়ে হায়ওয়ান” (এক প্রকার বিশেষ পানি) দ্বারা মিশানো হয়েছে। জান্নাতের সমস্ত হুর তার উপর আশেক। যদি সে সমূদ্রে থুথু ফেলে, তাহলে সমস্ত পানি মিষ্টি হয়ে যাবে। তার কপালে লেখা আছেঃ “যে আমাকে চায়, সে যেন তার পরওয়ার দেগারের অনুগত্য করে”।
জান্নাতীদের সৌন্দয্য
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে, জান্নাতীগণের শোভা-সৌন্দর্য্য যথারীতি বৃদ্ধিই হতে থাকবে, দুনিয়ায় তো ধীরে ধীরে বার্ধক্য আসতে থাকে; কিন্তু আখেরাতে রূপ-যৌবন বাড়তেই থাকবে।
জান্নাতের সবচে বড় নেয়ামত
হযরত সোহাইব (রাঃ) বলেন যে, হুজুর আকরাম (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেনঃ যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং দোজখীরা দোজখে চলে যাবে, তখন এক জন ঘোষক ডাক দিয়ে বলবেন হে জান্নাতীগণ! আল্লাহ্ পাক তোমাদের কাছে (যে) ওয়াদা করেছিলেন, সে ওয়াদা এখন পুরন করতে চান। জান্নাতীগণ বলবেন, সেটা আবার কি? আল্লাহ্ কি আমাদের মীজান ভারী করে দেন নি? আমাদের চেহারা কি উজ্জ্বল করেন নি? আমাদেরকে কি জান্নাতে প্রবেশ করান নি? এবং দোজখ থেকে কি মুক্তি দেন নি? (তাহলে আবার কি ওয়াদা বাকী রইল)।
আল্লাহ্ রাসূল ((সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এরশাদ মুতাবিক জানা যায় যে, এ অবস্থায় তখন পর্দা উঠিয়ে দেয়া হবে, ফলে জান্নাতীগণ আল্লাহর দীদারে সৌভাগ্যবান হবেন। আল্লাহর কসম! জান্নাতীগণের জন্যে এর চেয়ে অধিক প্রিয় এবং উত্তম নেয়াতম কোনটাই হবেনা। (হে রাহমানুর রাহীম আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এ নিয়ামত নসীব করুন। (আমীন)
জান্নাতে পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হবে না
হযরত যায়দ ইবেন আরক্বাম (রাঃ) বলেন যে, জনৈক আহলে কিতাব হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর খেদমতে এসে বলতে লাগলো, আপনার মতে কি জান্নাতে খানা-পিনার ব্যবস্থা আছে? তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরমালেন, হাঁ জান্নাতে এক ব্যাক্তিকে পনাহার ও সহবাসের ক্ষেত্রে এক শত ব্যক্তর শক্তি দেওয়া হবে।
সে বলতে লাগলো, পানাহারের পর তো পেশাব পায়খানা অবশ্যই হয়ে থাকে, তাহলে জান্নাতের মত পবিত্র স্থানে এমন নোংরা কাজ কিভাবে হবে?
তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করলেন জান্নাতে পেশাব-পায়খানার প্রয়োজনই হবেনা, বরং মেশকের সুগন্ধি যুক্ত ঘাম বেরুবে মাত্র, এতেই খানা হজম হয়ে যাবে।
আমলনামা
প্রত্যেক মানুষের কাঁধে কেরামন কাতেবীন নামক দুইজন করিয়া ফেরেশতা সদা-সর্বদা অবস্থান করেন। ইহারা মানুষের পাপ-পুণ্য লিপিবদ্ধ করেন। তা সে যত সাবধানে, যত গোনেই করুক না কেন, এবং কাজটি যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন তাহা বিন্দু মাত্রও কেরামন-কাতেবীনের লেখা হইতে বাদ পড়ে না । প্রতেক বৃহিস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে (জুম্মা রাত্রে) এই দৈনিক কার্য তালিকা একত্রিত করিয়া সাপ্তাহিক দলিল বা কার্য বিবরণী প্রস্তুত করা হয় । যদি কোন লোক জুম্মা রাত্রে গত এক সাপ্তাহের কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হইয়া তওবা করে, তবে তাহার ঐ সপ্তাহের গোণাহ্গুলি কাটিয়া সাপ্তাহিক কার্যবিবরনীতে শুধু নেকি বা পূণ্য কর্মগুলিই লিখিয়া লওয়া হয় । প্রতি বৎসর সবে ক্বদরের রাত্রিতে প্রত্যেকের সাপ্তাহিক কার্যতালিকাগুলি একত্রিত করিয়া একখানা বার্ষিক তালিকা তৈরী করা হয় । যাহারা শবে ক্বদরের রাত্রিতে সারা রাত্রি জাগরিত থাকিয়া আল্লাহপাকের জিকির আজকার ও ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকেন এবং নিজের কৃত গোণাহের জন্য অণুতপ্ত হইয়া তওবা করেন, তাহাদের বার্ষিক কার্যতালিকা হইতে গোণাহ্গুলো কাটিয়া দিয়া শুধু নেকীগুলো লিপিবদ্ধ করিয়া একখানা দলিল প্রস্তুত করা হয় । প্রত্যেক মানুষের নামে প্রতি বৎসর একখানা কার্য তালিকা তৈরী হতে থাকে এবং তাহার মৃতু্যর পর সব গুলি কার্যতালিকা একত্রিত করিয়া একখানা পূর্ণ পাকা দলিল প্রস্তুত করা হয় । ইহারই নাম আমল নামা । কিয়ামতের দিন উক্ত আমলনামা প্রত্যেকের হাতে দেওয়া হইবে । যাহারা পূর্ণ্যবান ব্যক্তি তাহাদের আমলনামা সম্মুখের দিকে দিয়া ডান হাতে দেওয়া হইবে এবং অতি সহজে তাহাদের বিচার সমাপ্ত করিয়া বেহেশ্তে যাইবার অনুমতি দেওয়া হইবে। আর যাহারা পাপী, তাহাদের পিছনের দিক দিয়া বাম হাতে আমল নামা প্রদান করা হইবে এবং অতি কঠোর ভাবে তাহাদের হিসাব নিকাশ লইয়া দোজখে প্রেরণ করা হইবে ।
কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজ নিজ আমলনামা ঊচ্চঃস্বরে পাঠ করিতে আদেশ করা হইবে । পুণ্যবান ব্যক্তিগণ অনর্গল পাঠ করিয়া যাইবে । আর পাপীগণ নিজের পাপ কাজের বর্ণণা সবার সামনে পাঠ করিতে লজ্জা অণুভব করিয়া পাঠে বিরত হওয়া মাত্র ফেরেশতাগণ তাহাদিগকে ধমকাইয়া বলিবেন যে, কেন পড়িতেছ না তখন তাহারা বলিবে যে, কোটি কোটি লোকের সম্মুখে আমাদের পাপ কাজের বর্ণনা গুলি পাঠ করিতে লজ্জা হইতেছে । ফেরেশতাগণ বলিবেন যে, দুনিয়াতে যখন পাপ কাজ করিয়াছ তখন লজ্জিত হও নাই; এখন লজ্জা করিয়া কি লাভ হইবে ? তোমাদিগকে আমলনামা পাঠ করিতেই হইবে এই বলিয়াই আগুনের চাবুক দ্বারা প্রহার করিতে থাকিলে তাহারা উপায়ন্তর না দেখিয়া আমলনামা পাঠ করিতে থাকিবে । অতএব প্রত্যেক মুসলমান স্ত্রী-পুরুষের একান্ত কর্তব্য যে তাহারা নিজ নিজ আমলনামা যাহাতে পাপশূন্য হয়, তাহার জন্য সব সময় চেষ্ঠা করা।
আখিরাত
কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের পর ৪০বছর পর্যন্ত কোন মানব-দানব, জ্বীন-পরী, ফেরেশতা, পশু-পক্ষী প্রভৃতি কোন প্রাণীই জীবিত থাকিবে না। তারপর আল্লাহপাকের আদেশে হযরত জিব্রাইল, মিকাইল, ইসরাফিল, আজরাইল (আঃ) এবং আল্লাহর আরশবাহী ৮জন ফেরেশতা ও বেহেশতের রক্ষক রেজওয়ান ও দোযখের দারগা মালেক ফেরেশতা জীবিত হইবেন। তারপর আল্লাহ পাকের আদেশে ইসরাফিল (আঃ) পুনরায় তাঁহার শিঙ্গায় ফুঁৎকার দিলে হযরত আদম (আঃ) হইতে আরম্ভ করিয়া মহাপ্রলয় পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছে ও মৃতু্মুখে পতিত হইয়াছে, সকলেই কবর হইতে উত্থিত হইবে। এ সমদ্ধে আল্লাহ পাক তাঁহার কালাম কুরআন মজিদে ঘোষনা করিয়াছেনঃ
وُنُفِخَ فِىْ الصُّوْرِ فَاِذَاهُمْ مِنَ الْاَجْدَاثِ اِلَي رَبِّهِمْ يَنْسِلُوْنَ قَا لُوْا يَوْيَلُوْنَ مِنْ بَعَثْنَا مِنْ مَرْقَدِنَا هَذَا مَاوْعَدَا الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُوْنَ
উচ্চারণঃ ওয়া নুফিখা ফিচ্ছুরি ফাইযা হুম মিনাল আজদাছি ইলা রাবি্বহিম ইয়ানসিলুনা ক্বালু ইয়াও ইয়ালোনা মিন বা’ছনা মিন মারক্বাদ্বিনা হা-যা মাওয়াদার রাহমানু ওয়া ছাদাক্বাল মুরছালুন ।
অনুবাদ ঃ অর্থাৎ যে সময় ইসরাফিল (আঃ) পনুরায় শিঙ্গায় ফুঁক দিবেন, তখন সকলে আপন আপন সমপাধি হইতে উত্থিত হইয়া তাহাদের প্রভুর দিকে (আল্লাহর নিকট) ধাবিত হইবে। তাহারা বলিবে হায়! কে আদিগকে মাহানিদ্রার স্থান হইতে জাগরিত করিল? ফেরেশতাগণ বলিবেন, ইহাই সেই কিয়ামত যাহা করুণাময় আল্লাহপাক অঙ্গীকার করিয়াছেন এবং নবী রাসূরগণ বলিয়াছেন।
কিয়ামতের দিন জ্বীন-ইনছান, পশু-পক্ষী, কীট_পতঙ্গ সবাই পুনর্জীবিত হইয়া হাসরের মাঠে একত্রিত হইবে । তারপর আল্লাহ পাক নিজে বিচারক হইয়া পাপ পুণ্যের বিচার করে পুণ্যবানদিগকে বেহেশতে এবং পাপীদিগকে দোজখে প্রেরণ করিবেন ।
যখন বেহেশ্তী ও দোজখীদের নিজ নিজ স্থানে উপস্থিত করা হইবে তখন জান্নাতী ও দোজখীদিগকে মাঝামাঝি স্থানে দুম্বার আকৃতি বিশেষ আনয়ন করিয়া তাহাকে জবেহ করা হইবে এবং বেহেশতী ও দোজখীদিগকে সম্বোধন করিয়া বলা হইবে যে, অদ্য হইতে তোমার আর কখনও মৃতু্য হইবে না। অতঃপর বেহেশতীগন অনন্তকাল পরম সুখে কাল যাপন করিতে থাকিবে। আর দোজখীগণ চিরকালের জন্য দোযখের কঠোর যন্ত্রণা ভোগকরিতে থকিবে। দজোখবাসীদের সম্বন্ধে আল্লাহপাক বলিয়াছেন —-
لاَ يَمُوْتُ فِيْهَا وَلاَيَحْىَ
–সেখানে তাহারা মরিবেও না।
