বিসমিল্লাহ। ওয়ালহা'মদুলিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ'লা রাসূলিল্লাহ। আম্মা বা'দ।
***ঈমানদার নারী বা পুরুষ যদি বিশ্বাস ও আন্তরিকতার সাথে দুয়া করে তাহলে আল্লাহ তাআ’লা তাদের প্রত্যেকটা দুয়াই কবুল করে নেন। দুয়া কবুল হতে দেরী হলেও বা দুয়া কবুল কিভাবে হয়েছে এটা বুঝতে না পারলেও দুয়া কবুল হয়েছে এই বিষয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখা যাবেনা। মনে রাখতে হবে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা যে, মৃত্য পর্যন্ত বান্দা ধৈর্য ধরে আল্লাহর প্রতি ঈমান ও নেক ধারণ পোষন করে কিনা।
আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ
“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব”।
সুরা গাফিরঃ ৬০।
“তোমরা কাকুতি-মিনতি সহকারে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক, নিশ্চয় তিনি সীমালংঘন কারীদেরকে পছন্দ করেন না”।
সুরা আ’রাফঃ ৫৫।
“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমার কাছে দুয়া কর আমি তোমাদের দুয়া কবুল করব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে”।
সুরা আল-মুমিনঃ ৬০।
“আর তিনিই হচ্ছেন (উপাস্য), যিনি আর্তের আহবানে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং তার বিপদ-আপদ দূর করে দেন”।
সুরা নামলঃ ৬২।
"আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে তাদেরকে বলোঃ আমিতো তাদের কাছেই রয়েছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দেই"।
সুরা আল-বাক্বারাহঃ ১৮৬।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
“দুআ-ই হল ইবাদত”।
আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা ৩৮২৮।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ
“সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হল দুআ”।
হাকেম, সহীহ জামিহ ১১২২।
“আল্লাহর কাছে দুআর চেয়ে উত্তম কোনো ইবাদত নেই”।
তিরমিজী ৩৩৭০ আলবানী, সহীহুল জামি’ ৫৩৯২।
***কোনো মুসলিম ব্যক্তির দুআ কখনোই বৃথা যায় নাঃ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কোন ব্যক্তির দো‘আ গৃহীত হয়; যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে; বলে, ‘আমার প্রভুর নিকট দো‘আ তো করলাম, কিন্তু তিনি আমার দো‘আ কবূল করলেন না।”
সহীহ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে,
“বান্দার দো‘আ ততক্ষণ পর্যন্ত কবূল করা হয়, যতক্ষণ সে গুনাহর জন্য বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার জন্য দো‘আ না করে, আর যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে।” জিজ্ঞাসা করা হল, ‘হে আল্লাহর রসূল! তাড়াহুড়ো মানে কি?’ তিনি বললেন, “দো‘আকারী বলে, ‘দো‘আ করলাম, আবার দো‘আ করলাম, অথচ দেখলাম না যে, তিনি আমার দো‘আ কবূল করছেন।’ কাজেই সে তখন ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বসে পড়ে ও দো‘আ করা ত্যাগ করে দেয়।”
সহীহুল বুখারী ৬৩৪০, মুসলিম ২৭২৯।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“পৃথিবীর বুকে যেকোনো মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দো‘আ করে (তা ব্যর্থ যায় না); হয় আল্লাহ তা তাকে দেন অথবা অনুরূপ কোন মন্দ তার উপর থেকে অপসারণ করেন; যতক্ষণ পর্যন্ত সে (দোআ’কারী) গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার দোআ’ না করবে।”
একটি লোক বলল, ‘তাহলে তো আমরা অধিক মাত্রায় দো‘আ করব।’ তিনি বললেন, “আল্লাহ সর্বাধিক অনুগ্রহশীল”।
তিরমিযী ৩৫৭৩, আহমাদ ২২২৭৯, ইমাম তিরমিযী ও শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি হাসান সহীহ।
***দুয়া ৩ ভাবে কবুল হতে পারেঃ
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
“যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি দুআ করে, যে দুআতে কোনো পাপ থাকে না ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তাহলে আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে তার দুআ অবশ্যই কবুল করে নেন। যে দুআ সে করেছে হুবহু সেভাবে তাই কবুল করেন অথবা তার দুআর প্রতিদান আখেরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন কিংবা এ দুআর মাধ্যমে তার ওপর আগত কোনো বিপদ তিনি দূর করে দেন। এ কথা শুনে সাহাবীগণ বললেন, আমরা তাহলে অধিক পরিমাণে দুআ করতে থাকবো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমরা যত প্রার্থনাই করবে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক বেশি কবুল করতে পারেন”।
বুখারীঃ আল-আদাবুল মুফরাদ ৭১০ ও আহমদ।
***দুয়া কবুল না হওয়ার কয়েকটি কারণঃ
কিছু পাপ আছে যা বান্দার মাঝে উপস্থিত থাকলে তার দুয়া কবুল হওয়ার জন্য বাঁধা হয়ে যায়। তাই খেয়াল রাখতে হবে, এই পাপগুলো এড়িয়ে চলতে হবে, যদি কেউ চায় তার দুয়া কবুল করা হোক।
দুআ কবুলের অন্তরায় সমূহঃ
১. হারাম খাদ্য, হারাম পানীয় ও হারাম বস্ত্র
কেউ হারাম কোনো খাবার খেলে বা কারো খাবার হারাম টাকায় কেনা হলে, পোশাক হারাম বা হারাম টাকায় কেনা হলে আল্লাহ ঐ অবস্থায় তার দুয়া কবুল করেন না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"হে মানব সকল! আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। তিনি এ ব্যাপারে মুমিনদের সে নির্দেশই দিয়েছেন যে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন রাসুলদেরকে। তিনি বলেছেনঃ
"হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর ও সৎকর্ম কর, তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত"।
এবং আল্লাহ (মুমিনদেরকে উদ্দেশ্য) করে বলেছেনঃ
"হে মুমিনগণ! তোমাদের আমি যেসব পবিত্র বস্তু দিয়েছি তা হতে আহার কর।"
এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা বললেন, যে দীর্ঘ সফর করে মাথার চুলগুলোকে এলোমেলো করেছে এবং পদযুগল ধুলায় ধুসরিত করেছে অতঃপর আকাশের দিকে হাত তুলে দুআ করে, হে প্রভু! হে প্রভু! কিন্তু তার খাদ্য হারাম, তার পোশাক হারাম, তার শরীর গঠিত হয়েছে হারাম দিয়ে, কিভাবে তার দুআ কবুল করা হবে?"
সহীহ মুসলিম।
২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ বর্জন করাঃ
মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহবান না করলে বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে না বললে অর্থাৎ দাওয়াত ও তাবলীগে অবহেলা করলে তার দুয়া আল্লাহ কবুল করেন না।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের প্রতি শাস্তি নাযিল করবেন অতঃপর তোমরা দুআ করবে কিন্তু তিনি তা কবুল করবেন না।"
তিরমিজী, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
৩. দুআ কবুলে তাড়াহুড়ো করা
অনেকে কিছুদিন দুয়া করার পরে আল্লাহর বিশেষ কোনো হেকমত অনুযায়ী দুয়া কবুল হতে দেরী হলে তাড়াহুড়া করে বা হতাশ হয়ে পড়ে। অভিযোগ করা শুরু করে দেয়, কই এতো দুয়া করলাম, আল্লাহ দুয় কবুল করেন না...আল্লাহ মনে হয় আমাদের কথা শুনেন না (নাউযুবিল্লাহ নাফরমানী ও কুফুরী কথা!)
এইসব কথা বলার শাস্তিস্বরূপ সত্যিই আল্লাহ তার দুয়া আর কবুল করেন না। এইজন্য ধৈর্য ধরে দুয়া করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে জাকারিয়া (আঃ) অনেক অনেক বছর দুয়া করার পরে তাঁর দুয়া কবুল হয়েছিলো, তিনি পুত্র সন্তান পেয়েছিলেন একেবারে বৃদ্ধ বয়সে। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আর আমরা নিশ্চয়ই তাঁর থেকে উত্তম না (নাউযুবিল্লাহ)।
এইজন্য অবস্থা যাইহোক, ধৈর্য ধরতে হবে ও আল্লাহ কাছে আশা রেখে দুয়া করে যেতে হবে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"বান্দার দুআ সর্বদা কবুল করা হয় যদি সে দুআতে পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কের ছিন্ন করার কথা না বলে এবং তাড়াহুড়ো না করে। জিজ্ঞেস করা হল হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়ো বলতে কি বুঝায়? তিনি বললেন, দুআতে তাড়াহুড়া হল, প্রার্থনাকারী বলে আমিতো দুআ করলাম কিন্তু কবুল হতে দেখলাম না। ফলে সে নিরাশ হয় ও ক্লান্ত হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেয়।
সহীহ মুসলিম।
দুআয় এ ধরনের তাড়াহুড়া করা আল্লাহ অপছন্দ করেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ
"আর মানুষ অকল্যাণের দুআ করে, যেভাবে সে কল্যাণের দুআ করে, তবে মানুষ তো অতিমাত্রায় ত্বরা প্রিয়। (আল ইসরাঃ ১১)
তবে দুআর ভিতরে এ কথা বলা নিষেধ নয় যে, হে আল্লাহ এটা আমাকে খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও। দুআতে তাড়াহুড়া করার অর্থ হল দুআ করে কেন এখনো দুআ কবুল হলো না এমন ভাবনা নিয়ে ক্লান্ত হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেয়া।
৪. অন্তরের উদাসীনতাঃ
মুখে দুআ করে আর যদি দুআর প্রতি অন্তর উদাসীন থাকে তাহলে দুআ কবুল হয় না। অর্থাৎ যে দুয়া করে সে শুধু মুখে মুখে দুয়া করে, কিন্তু দুয়া কবুল হবে এমন দৃঢ় আশা, বিশ্বাস বা আল্লাহর প্রতি আস্থা নাই (নাউযুবিল্লাহ)!
যেমন হাদীসে এসেছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"প্রার্থনা কবুল হবে এ দৃঢ় বিশ্বাস রেখে তোমরা দুআ করবে। এবং জেনে রাখ আল্লাহ কোনো উদাসীন অন্তরের প্রার্থনা কবুল করেন না।"
তিরমিজী, হাকেম, হাদীস সহীহ, সিলসিলাহ সহীহাহঃ ৫৯৪।
অতএব দুআয় যা কিছু বলা হবে তার প্রতি অন্তরের একনিষ্ঠ ভাব থাকতে হবে। মুখে যা বলা হল, মন তার কিছুই বুঝল না। আবার অন্তর বুঝল ঠিকই, কিন্তু তার কথার প্রতি একাগ্রতা ছিল না, মনে ছিল অন্য চিন্তা-ভাবনা। তাহলে এ দুআকে বলা হবে উদাসীন অন্তরের প্রার্থনা। যা আল্লাহ কবুল করেন না।
৫. ব্যক্তিত্বের এক বিশেষ ধরনের দুর্বলতাঃ
কিছু চারিত্রিক ত্রুটির কারণেও দুয়া কবুল করা হয়না। যেমন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
"তিন ব্যক্তি এমন যে তাদের দুআ কবুল করা হয় না।
এক. যে ব্যক্তির অধীনে দুশ্চরিত্রা নারী আছে কিন্তু সে তাকে তালাক দেয় না।
দুই. যে ব্যক্তি অন্য লোকের কাছে তার পাওনা আছে কিন্তু সে তার স্বাক্ষী রাখেনি।
তিন. যে ব্যক্তি নির্বোধ ব্যক্তিকে সম্পদ দিয়ে দেয় অথচ আল্লাহ বলেন, "তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের সম্পদ দিও না।"
হাকেম ও তাহাবী, হাদীস সহীহ, সহীহুল জামিঃ ৩০৭৫।
মোনাজাত যেইভাবে করতে হবেঃ দুয়া করার আদব –
দুআ করার আদবসমূহঃ
১. দুআর শুরুতে আল্লাহর হামদ (প্রশংসা) করে এর পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ছোট/বড় যেকোনো দরুদ পড়ে এর পরে নিজের জন্য দুয়া করতে হবে। দুআর শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পড়া দুআ কবুলের সহায়ক বলে হাদীসে এসেছে।
"একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন এক ব্যক্তি দুআ করছে কিন্তু সে দুআতে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করেনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, সে তাড়াহুড়ো করেছে। অতঃপর সে আবার প্রার্থনা করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অথবা অন্যকে বললেন, যখন তোমাদের কেউ দুআ করে তখন সে যেন আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও তার গুণগান দিয়ে দুআ শুরু করে। অতঃপর রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করে। এরপর যা ইচ্ছা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে।
আবু দাউদঃ ১৪৮১, তিরমিজীঃ ৩৪৭৭, শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি সহীহ।
*প্রশংসা হিসেবেঃ আলহা'মদুলিল্লাহি রাব্বিল আ'লামিন বা আরো অন্য কিছুও বলা যায়
*দুরুদ হিসেবেঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আ'লা মুহা'ম্মাদ ও আ'লা আলি মুহা'ম্মাদ, অথবা অন্য যেকোনো দুরুদ পড়া যাবে।
২. দুআ করার সময় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দুআ করাঃ
এইভাবে দুয়া করা যাবেনা যে, "হে আল্লাহ আপনার ইচ্ছা দুয়া কবুল করেন..."
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
"তোমাদের কেউ এ রকম বলবে নাঃ হে আল্লাহ আপনি যদি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে অনুগ্রহ করুন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করবে এবং মনে রাখবে তিনি যা চান তা-ই করেন, তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।
সহীহ বুখারীঃ ৭৪৭৭।
আবার উদাসীন হয়েও দুয়া করা যাবেনা।
৩. বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দুআ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ ও তার শাস্তি থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহ নিয়ে দুআ করাঃ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ
"তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ করবে"। (আল-আরাফঃ ৫৫)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
"তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করে ও তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে আশা ও ভীতির সঙ্গে এবং তারা থাকে আমার নিকট বিনীত"। (আল-আম্বিয়াঃ ৯০)
৪. আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে ধর্না দেয়া এবং নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও বিপদের কথা আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা
৫. আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর মহৎ গুণাবলি দ্বারা দুআ করাঃ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ
"আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সে সকল নাম দিয়ে প্রার্থনা করবে"। (আল-আরাফঃ ১৮০)
আল্লাহ তাআলার সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলির মাধ্যমে দুআ করার কথা আল-কুরআনে ও হাদীসে বহু স্থানে এসেছে।
আল্লাহর সুন্দর নামগুলো উল্লেখ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন শুনলেন এক ব্যক্তি সালাতে আত্তাহিয়্যাতুর বৈঠকে এ বলে দুআ করছে :
أللهم إني أسألك يا الله الأحد الصمد الذي لم يلد ولم يولد ولم يكن له كفوا أحد، أن تغفر لي ذنوبي إنك أنت الغفور الرحيم. فقال صلى الله عليه وسلم : "قد غفر له، قد غفر له. )رواه أبو داود والنسائي وأحمد وابن خزيمة وصححه الحاكم(
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি- আপনি তো এক; অদ্বিতীয়, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। কেউ নেই তাঁর সমকক্ষ- আপনি আমার পাপগুলো ক্ষমা করুন। আপনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়াময়"।
এ প্রার্থনা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে! তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। (আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনু খুযাইমা)
উল্লেখিত ব্যক্তি আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে দুআ করার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ কবুলের সংবাদ দিলেন।
ইউনূছ আ. এর প্রার্থনা -যখন তিনি মাছের পেটে ছিলেন- তুমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই তুমি পবিত্র, মহান! আমি তো সীমালংঘনকারী। যে কোনো মুসলিম এ কথা দিয়ে প্রার্থনা করবে তার প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করবেন। (তিরমিজী)
৬. আল্লাহর কাছে নিজের পাপ ও গুনাহ স্বীকার করে লজ্জিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৭. প্রার্থনাকারী নিজের কল্যাণের দুআ করবে নিজের বা কোনো মুসলিমের অনিষ্টের জন্য দুআ করবে না বা বদদুয়া করবেনা।
৮. সৎকাজের অসীলা দিয়ে দুআ করাঃ
যেমন সহীহ হাদীসে বিপদগ্রস্ত তিন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যারা এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে পাথর ধসে পড়ার কারণে পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়েছিল। তারা তখন প্রত্যেকে নিজ নেক আমলের অসীলা দিয়ে প্রার্থনা করেছিল। একজন মাতা-পিতার উত্তম সেবার কথা বলেছিল। দ্বিতীয়জন ব্যভিচারের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও এ কাজ থেকে বিরত থেকে ছিল। তৃতীয় জন এক ব্যক্তির আমানত রক্ষা ও তাকে ফেরত দিয়েছিল। এরা প্রত্যেকে বলেছিল, হে আল্লাহ আমি যদি এ কাজটি আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য করে থাকি তাহলে এ কাজের অসীলায় আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর এ বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। আল্লাহ তিনজনের প্রার্থনাই কবুল করে তাদের বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীসে দেখা যায় যে নেক আমলের অসীলা দিয়ে দুআ করলে দুআ কবুল হয়।
৯. বেশি বেশি করে ও বার বার দুআ প্রার্থনা করাঃ
যেমন হাদীসে এসেছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
"তোমাদের কেউ যখন দুআ করে সে যেন বেশি করে দুআ করে কেননা সে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে"। (মুসলিম)
১০. সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় দুআ করাঃ
মানুষ কখনো সুখের সময় অতিবাহিত করে কখনো দুঃখের সময়। অনেক মানুষ এমন আছে যারা শুধু বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকেন ও প্রার্থনা করেন। আবার অনেকে এমন আছেন যারা বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকতে ভুলে যান। কিন্তু সত্যিকার মুমিন ব্যক্তি সুখে ও দুঃখে সর্বদা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
"যে চায়, আল্লাহ বিপদ-মুসীবতে তার প্রার্থনা কবুল করুন সে যেন সুখের সময় আল্লাহর কাছে বেশি করে প্রার্থনা করে"। (তিরমিজী ও হাকেম)
১১. দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করাঃ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি সুন্নাহ হল তিনি কোনো কোনো দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করতেন। যখন মুশরিকরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালাতাবস্থায় উটের নাড়ী-ভুঁড়ি তাঁর পিঠের ওপর রাখল তখন তিনি সালাত শেষ করে দুআ করলেন এভাবেঃ
"হে আল্লাহ কুরাইশদের তুমি পাকড়াও করো! হে আল্লাহ কুরাইশদের তুমি পাকড়াও করো!! হে আল্লাহ কুরাইশদের তুমি পাকড়াও করো!!!
১২. দুআয় উচ্চস্বর পরিহার করাঃ
অনেক মানুষকে দেখা যায় তারা দুআ করার সময় স্বর উচু করেন বা চিৎকার করে দুআ করেন। এটা দুআর আদবের পরিপন্থী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ
"তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ কর; তিনি সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না"। (আল-আরাফঃ ৫৫)
এ আয়াতে গোপনে দুআ করতে বলা হয়েছে এবং দুআয় সীমালংঘন সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রায় সকল তাফসীরবিদের অভিমত হল এ আয়াতে সীমালংঘনকারী বলতে তাদের বুঝানো হয়েছে যারা উচ্চ আওয়াযে দুআ করে।
আল্লাহ তাআলা নবী যাকারিয়া আ. এর প্রশংসায় বলেছেন :
"যখন সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করেছিল নিভৃতে"। (মারইয়ামঃ ০৩)
এ আয়াতে গোপনে দুআ করতে বলা হয়েছে এবং দুআতে সীমালংঘন থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
"হে মানবসকল! তোমরা নিজেদের ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা কোনো বধির বা অসুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তোমরাতো ডাকছ এমন সত্তাকে যিনি সর্বশ্রোতা ও অতি নিকটে এবং তোমাদেরই সঙ্গে"। (বুখারী ও মুসলিম)
যখন একদল সাহাবী উচ্চ আওয়াযে দুআ করছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেছিলেন।
১৩. দুআ প্রার্থনার পূর্বে অযু করাঃ
আবু মুছা আল-আশআরী রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছেঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুআ করতে ইচ্ছা করলেন তখন পানি চাইলেন, অযু করলেন অতঃপর দু’হাত তুলে বললেন : ‘হে আল্লাহ! তুমি কিয়ামতে তাকে অনেক মানুষের উপরে স্থান দিও। আমি বললাম আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তুমি আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েসের পাপ ক্ষমা কর ও তাকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করিও। (বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীসে দেখা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করার পূর্বে অজু করে নিলেন।
ইবনু হাজার রহ. বলেন, এ হাদীস দ্বারা আমরা জানলাম যে, দুআ করার পূর্বে অজু করে নেয়া মুস্তাহাব। (ফাতহুল বারী)
*দুয়ার পূর্বে উত্তম হচ্ছে ওযু করা, এটা ফরয নয়।
১৪- দুআয় দুহাত উত্তোলন করা :
যেমন হাদীসে এসেছে
আবু মুছা রা. বলেন, অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু হাত তুললেন এবং বললেন, "হে আল্লাহ! তুমি উবাইদ আবি আমেরকে ক্ষমা করে দিও"।
তিনি এতটা হাত তুললেন যে আমি তার বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। (বুখারী)
১৫- কিবলামুখী হওয়া
দুআর সময় কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব। যেমন হাদীসে এসেছে :
عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال : "استقبل النبي صلى الله عليه وسلم الكعبة، فدعا على نفر من قريش. (رواه البخاري 3960 ومسلم 1794(
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার দিকে মুখ করলেন এবং কতিপয় কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে দুআ করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)