কিছু বক্তা ওয়াইস কারনী (রহঃ) এর দাঁত ভাংগার একটা কিসসা বলে থাকেন। তারা বলে উহুদের ময়দানে প্রিয় রাসুল (সাঃ) এর দাঁত শহীদ হবার খবর শুনে ওয়াইস কারনী এক এক করে ঊনার সব দাঁত ভেংগে ফেলেন । আল্লায়ই ভালই জানেন এরকম কাহিনী কোথায় পেলো। ওয়াইস কারনীর ঐসব ঘটনা সঠিক না। কোন সহীহ হাদিসের কিতাবে নেই। অল্প শিক্ষিত হুজুর আর ভন্ড পীরদের বানানো এই সমস্ত ভুয়া কাহিনী বিশ্বাস করবেন না।
উয়াইস ক্বারনী (রহঃ) কে ছিলেন?
উয়াসি ক্বারনী (রহঃ) একজন তাবেয়ী ছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে দেখা করতে পারেন নি। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবীদেরকে তার কথা বলে গিয়েছিলেন, অমুক বংশের উয়াইস নামে একজন লোক তোমাদের কাছে আসবে। সে তার মায়ের খুব সেবা-যত্ন করে। একবার তার কুষ্ঠ রোগ হয়েছিলো, কিন্তু সে আল্লাহর কাছে দুয়া করেন এইজন্য আল্লাহ তাঁকে ভালো করে দেন। সে তাবেয়ীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ একজন ব্যক্তি। তোমরা তাঁকে তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করতে বলবে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর এই ভবিষ্যতবাণী পরবর্তীতে সত্যি হয় উমার (রাঃ) এর যুগে। তার সাথে সাহাবীদের দেখা হয়। কিন্তু এর পরে উয়াইস ক্বারনী (রহঃ) সম্পর্কে খুব বেশী জানা যায়না। সম্ভবত নাম ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে তিনি আত্মগোপন করেন।
আমাদের দেশে বিদাতী সূফী আর পীর-মুরিদীর লোকেরা উয়াইস ক্বারনী (রহঃ) কে অনেক বানোয়াট আজগুবী কিসসা বলে তাদের শিরক বিদাতকে প্রমান করতে চায়। এইগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। সহীহ হাদীসের বাইরে কোনো কথা বিশ্বাস করবেন না।
উয়াইস ক্বারনী (রহঃ) সম্পর্কে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসগুলোঃ
সহিহ মুসলিম :: বই ৩১ :: হাদিস ৬১৭০
উসায়র ইবন জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, কুফার একটি প্রতিনিধি দল উমর (রাঃ)-এর কাছে এলো। তাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিও ছিল, যে উওয়াস (র) কে উপহাস করত। তখন উমর (রাঃ) বললেন, এখানে করনী গোত্রের কোন লোক আছে কি? তখন সেই লোকটি এলো। এরপর উমর (রাঃ) বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের কাছে ইয়ামন থেকে এক ব্যক্তি আসবে, যে উওয়াস নামে পরিচিত। ইয়ামানে তাঁর মা ব্যতীত কেউ থাকবে না। তার শ্বেতরোগ হয়েছিল। সে আল্লাহর কাছে দূআ করার বদৌলতে আল্লাহ তাকে শ্বেত রোগ মুক্ত করে দেন। তবে কেবল মাত্র এক দীনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্হান বাকী থাকে। তোমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ তাঁর সাক্ষাৎ পায় সে যেন নিজের জন্য তাঁর কাছে মাগফিরাতের দুআ কামনা করে।
সহিহ মুসলিম :: বই ৩১ :: হাদিস ৬১৭১
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি যে, অবশ্যই তাবিঈনগণের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে উওয়াস নামে পরিচিত। তাঁর একমাত্র মা আছে এবং তার শ্বেত রোগ হয়েছিল । তোমরা তাঁর কাছে অনুরোধ করবে যেন সে তোমাদের মাগফিরাতের জন্য দুআ করে।
সহিহ মুসলিম :: বই ৩১ :: হাদিস ৬১৭২
উসায়র ইবন জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল, যখন ইয়ামনের কোন সাহায্যকারী দল তার কাছে আসত তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করতেন, তোমাদের মধ্যে কি উওয়াস ইবন আমির আছে? অবশেষে তিনি উওয়াসকে পান। তখন তিনি বললেন, তুমি কি উওয়াস ইবন আমির? তিনি বললেন, হাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, মুরাদ গোত্রের কারান বংশের? বললেন, হাঁ। জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি শ্বেত রোগ ছিল এবং তা নিরাময় হয়েছে, কেবলমাত্র এক দিরহাম স্হান ব্যতীত? তিনি বললেন, হ্যা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মা কি আছেন? তিনি বললেন, হ্যা। তখন উমার (রাঃ) বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা) -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ “তোমাদের কাছে মুরাদ গোত্রের কারান বংশের উওয়াস ইবন আমির ইয়ামানের সাহায্যকারী দলের সঙ্গে আসবে। তাঁর ছিল শ্বেত রোগ। পরে তা নিরাময় হয়ে গিয়েছে। কেবলমাত্র এক দিরহাম ব্যতিরেকে। তার মা রয়েছেন। সে তাঁর প্রতি অতি সেবাপরায়ন। এমন ব্যক্তি আল্লাহর উপর কসম করে নিলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। কাজেই যদি তুমি তোমার জন্য তার কাছে মাগফিরাতের দুআ কামনার সুযোগ পাও তাহলে তা করবে।”
সূতরাং আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দুআ করুন। তখন উওয়াস (র) তার মাগফিরাতের জন্য দুআ করলেন। এরপর উমার (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি কোথায় যেতে চাও? তিনি বললেন, কুফা এলাকায়। উমার (রাঃ) বললেন, আমি কি তোমার জন্য কুফার গভর্ণরের কাছে চিঠি লিখে দেব? তিনি বললেন, আমি অখ্যাত গরীব লোকদের মধ্যে থাকাই পছন্দ করি। বর্ণনাকারী বলেন, পরবর্তী বছরে তাদের অতিজাত লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি হাজ্জ করতে এলো এবং উমার (রাঃ)-এর সংগে তার সাক্ষাৎ হল। তখন তিনি তাকে উওয়াস কারানী (র)-এর অবস্হা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। সে বলল, আমি তাঁকে জীর্ণ গৃহে সম্পদহীন অবস্থায় রেখে এসেছি । তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা) -কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ তোমাদের কাছে কারান বংশের মূরাদ গোত্রের উওয়াস ইবন আমির (রাঃ) ইয়ামানের একদল সাহায্যকারীর সঙ্গে আসবে। তার শ্বেত রোগ ছিল। সে তা থেকে আরোগ্য লাভ করে, এক দিরহাম পরিমাণ স্হান ব্যতীত । তাঁর মা রয়েছে, সে তার অতি সেবাপরায়ণ। যদি সে আল্লাহর নামে কসম খায় তবে আল্লাহ তা’আলা তা পূর্ণ করে দেন। তোমরা নিজের জন্য তাঁর কাছে মাগফিরাতের দুআ চাওয়ার সুযোগ পেলে তা করবে। সে ব্যক্তি উওয়াসের কাছে এল এবং বলল, আমার জন্য মাগফিরাত-এর দুআ করুন। তিনি বললেন, আপনি তো নেক সফর থেকে।