কোন ধর্ম এবং সে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র শূন্যে প্রতিষ্ঠা পায়না। সেখানে পূর্ব থেকেই একটি ধর্ম ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা থাকে। ইসলামের প্রতিষ্ঠা ঘটে সে ধর্মের ও সে ধর্মের অনুসারিদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে। কোন একটি গাছ লাগাতে হলেও কিছু মাটি এবং তার আশেপাশের আগাছা ছাফ করে স্থান করে দিতে হয়। তবে ইসলামের প্রতিষ্ঠা আর গাছ লাগোনা –এক জিনিষ নয়। আগাছা প্রতিবাদ করে না, কিন্তু মানুষ লড়াই শুরু করে। তাই যে কোন সমাজ বা রাষ্ট্রে অন্য একটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে সরানোর কাজ শুরু হলেই সাথে সাথে জিহাদও শুরু হয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় একমাত্র বিপক্ষ শক্তির পরাজিত করার মধ্যদিয়েই। নবীজী(সাঃ)র ন্যায় নরম হৃদয়ের মানুষের পক্ষেও সেটি এড়ানো সম্ভব হয়নি। কোন যুগেও সেটি সম্ভব নয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে সংঘাত অনিবার্য। সে সংঘাত শুধু অর্থ, শ্রম ও মেধা চায় না, রক্তও চায়। আরো কোন ইবাদতই এত বড় কোরবানী চায় না। জিহাদ এজন্যই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। সারা জীবন নামায-কালামের মধ্যদিয়েও কোন মু’মিন বিনা বিচারে জান্নাত পায়না, কিন্তু সেটি জিহাদে প্রাণদানকারি শহিদ পায়। মৃত্যুর পরও সে আল্লাহর পক্ষ থেকে রেজেক পায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর পক্ষ থেকে সে প্রতিশ্রুতি বহু বার এসেছে। অথচ ইসলামের বিপক্ষ শক্তি ইসলামের এ শ্রেষ্ঠ ধর্মকর্মটি চিহ্নিত করছে সন্ত্রাস বা জঙ্গি মতবাদ রূপে। তাদের সে লাগাতর মিথ্যাচারের কারণেই মুসলিম নাগরিকগণ চরম ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে জিহাদের সঠিক ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠতে। অথচ জিহাদের দর্শন বুঝতে ব্যর্থ হলে সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে কোরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যটি অনুধাবন করা। তখন অসম্ভব হয় এ বিশ্বজগত এবং মানব সৃষ্টি নিয়ে মহান আল্লাহর মূল ভিশনটি উপলব্ধি করা। অসম্ভব হয় নবী জীবনের মূল শিক্ষা থেকে সবক নেয়া। বস্তুত ইসলামের মূল শিক্ষাই তার কাছে অজানা থেকে যায়। তখন পদে পদে যেটি প্রকট রূপে দেখা দেয় সেটি পথভ্রষ্টতা।আজকের মুসলিম সমাজে তো মূলত সেটিই ঘটছে।
প্রশ্ন হলো, মানব-সৃষ্টি,রাসূলপ্রেরণ এবং কোরআন নাযিলের মাঝে মহান আল্লাহর মূল অভিপ্রায়টি কি? মহান আল্লাহতায়ালার লক্ষ্য কি সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর দখলদারি তার অবাধ্য শক্তির হাতে ছেড়ে দেয়া এবং তাঁর অনুসারিদের পরাজয় মেনে নেয়া? পবিত্র কোরআনের শিক্ষাকে কি শুধু কিতাবে ও মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে সীমিত রাখা? এটি তো তাঁর দ্বীনের জন্য পরাজয়ের পথ! মহান আল্লাহতায়ালার অভিপ্রায়টি কি সেটি তিনি অস্পষ্ট রাখেননি। পবিত্র কোরআনের নানা স্থানে সেটি সুস্পষ্ট ভাবে বর্নীত হয়েছে। যেমন সুরা হাদীদে বলেছেন,“আমি রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি,যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ উপকার। এটি এজন্য যে, আল্লাহ জেনে নিবেন কে (আল্লাহকে)না দেখে তাঁকে ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিধর ও পরাক্রমশালী।” সুরা হাদীদ, আয়াত ২৫। উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহপাকের যে উদ্দেশ্যটি প্রবল ভাবে ব্যক্ত হয়েছে তা হল,সমাজে ন্যায়নীতি ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠা। সে ন্যায়নীতির উৎস কোন রাজনৈতিক নেতা বা দার্শনিকের বানী নয়,কোন বিচারকের খেয়ালখুশি ভিত্তিক রায়ও নয়,এবং কোন সংসদের তৈরী আইনও নয়। বরং সেটি তাঁর নাযিলকৃত মহাজ্ঞানময় কোরআন। তবে সে কোরআনী ন্যায়নীতি ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠা শুধু রাসূল প্রেরণ ও কোরআন প্রেরণের কারণে ঘটে না। সে জন্য অপরিহার্য হলো শক্তির প্রয়োগও। সে বাস্তবতার নিরিখে তিনি শুধু কিতাবই নাযিল করেননি,লৌহও প্রেরণ করেছেন। লৌহ থেকে নির্মিত হতে পারে ঢাল-তলোয়ার,বর্শা এবং কামান যা ব্যবহৃত হতে পারে শত্রুর বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে। ইসলাম ও অনৈসলামের সে দ্বন্দে মহান আল্লাহতায়ালা মু’মিনদের জন্য নীরব বা সরব দর্শক হওয়ার কোন সুযোগ রাখেননি। স্রেফ নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আড়ালে ধার্মিক সাজার পথও খোলা রাখেননি। বরং তিনি সর্বদা এ নজরও রাখছেন কারা ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবেলায় তাঁকে ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তাই তাঁর দ্বীনে প্রকৃত ঈমানদারের জন্য জিহাদ থেকে পালানোর রাস্তা নেই। জান্নাতে যেতে হলে একমাত্র এ রাস্তা দিয়েই তাকে এগুতে হবে। স্বয়ং নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর মহান সাহাবাগণ একমাত্র এ পথ দিয়েই এগিয়েছিলেন। তাদের সামনেও এছাড়া অন্য কোন রাস্তাই খোলা ছিল না। প্রশ্ন হলো,ইসলামের এ প্রাথমিক জ্ঞানটুকু ছাড়া নবীজী (সাঃ)র বার বার জিহাদে যাওয়া এবং সে জিহাদে নিজে আহত হওয়া, শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবীর শহিদ হওয়ার মত মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে শিক্ষা নেয়া কি আদৌ সম্ভব? সম্ভব কি কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য বুঝা? মুসলমানগণ যে সে শিক্ষালাভে আজ চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে তা কি তাদের আজকের পরাজয়ই প্রমাণ করে না? তবে প্রকৃত অবস্থা আরো গুরুতর! আঁধারের চামচিকা যেমন আলোকে ঘৃনা করে, তেমনি মুসলিম নামধারি পথভ্রষ্টরা ঘৃনা করে কোরআনের আলোময় জ্ঞানকে। এবং চরম ঘৃণা করে সে কোরআনের অনুসারিদেরও। ফলে কোরআনের সে আলোকে রুখতে তারা পাচ্য-পাশ্চাত্যের কাফের শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়েছে।এবং যুদ্ধ শুরু করেছে কোরআনের অনুসারিদের বিরুদ্ধে।