মাঝহাব মানে মতামত ।
ইমামগণ তাঁদের মতামত দিয়েছেন নিজেদের কুরআন হাদিসের জ্ঞান থেকে এবং অত্যন্ত সতর্ক করে দিয়েছেন যে কেউ যেন সেই মতামত তিনি/তাঁরা কোথা থেকে কিসের ভিত্তিতে দিয়েছেন তা না জেনে গ্রহণ না করে ।
অর্থাত তাঁদের মতামত কোন আয়াত বা কোন হাদিসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে তা জানতে হবে, শুধু মতামত নিলে চলবে না!
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) বলেছেন,
- যে ব্যাক্তি আমার দলিল জানে না, তার জন্য আমার উক্তি দ্বারা ফতোয়া দেওয়া হারাম। (আন-নাফিউল কাবীর ১৩৫ পৃষ্ঠা)
- যদি আমি এমন কথা বলি যা আল্লাহর কিবাব ও রাসুলের (সা) হাদীসের পরিপন্থি, তাহলে আমার কথাকে বর্জন করো। (দেওয়ালে ছুড়ে মারো)। (ঈক্কাবুল হিমাম ৫০ পৃষ্ঠা)
কোনো ইমাম নিজেদের মাঝহাব প্রতিষ্ঠা করেন নি। তাঁদের অনুসারী ভক্তগণ তাঁদের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মূলত এমন হওয়া উচিত ছিলনা যে হানাফি মাঝহাব এটা, মালেকি ঐটা, হাম্বলী বা শাফেই সেইটা!
বরং যারা সহিহ হক কথা প্রচার করেন তারা কুরান হাদিসের দলিল উল্লেখপূর্বক বলেন যে এই আয়াত বা এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে আবু হানিফা (রঃ) এই বলেছেন বা ইমাম মালেক (রঃ) এই বলেছেন বা ইমাম আহমাদ (রাঃ) এই বলেছেন!
ইমাম শাফেই বলেছেন,
- আমি যে কথাই বলি না কেন অথবা যে নীতিই প্রনয়ন করি না কেন, তা যদি আল্লাহর রাসুল (সা) এর নিকট থেকে বর্ণিত (হাদীসের) খিলাপ হয়, তাহলে সে কথাই মান্য, যা রাসুল (সা) বলেছেন। আর সেটাই আমার কথা। (তারীখু দিমাশ্ক; ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ২/৩৬৬,৩৬৪)
- আমার পুস্তকে যদি আল্লাহর রাসুল (সা) এর সুন্নাহের খেলাপ কে কথা পাও, তাহলে আল্লাহর রাসুল (সা) এর কথাকেই মেনে নিও এবং আমি যা বলেছি তা বর্জন করো। (নাওয়াবীর মা’জমু ১/৬৩; ইলামূল মুওয়াক্কিঈন ২/৩৬১)
রাসুল (সাঃ) আমাদের জন্য কোনো মাঝহাব ছেড়ে যাননি। তিনি রেখে গেছেন কি?
”আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা এ দুটি আক্রে থাকবে ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না| বস্তু দুটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাত|” মুয়াত্তা মালেক হাদিস ৩৩৩৮ আল-জামে অধ্যায়; হাকেম হাদিস ৩১৯ ইলম অধ্যায়; মিশকাত ১৮৬ ইলাম অধ্যায়; সনদ হাসান|
অতএব দেখা যাচ্ছে কুরআন ও হাদিসের সাথে যেখানে যেই / যার মতামত বেশি মিলে যাবে সেটাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে ।
যেহেতু ইমামগণ মানুষ তাঁদের ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এবং তাঁরা নিজেদের রক্ষা করার জন্যই বলে গিয়েছেন, যেমন ইমাম আবু হানিফা (রঃ) বলেছেন,
আমরা তো মানুষ। আজ এক কথা বলি, আবার কাল তা প্রত্যাহার করে নিই -আন-নাফিউল কাবীর ১৩৫ পৃষ্ঠা।
''যখন হাদীস সহীহ হবে, তখন সেটাই আমার মাযহাব অর্থাৎ হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব। (ইবনুল আবেদীন ১/৬৩; রাসমুল মুফতী ১/৪; ঈক্কামুল মুফতী ৬২ পৃষ্ঠা) ''
''যখন হাদিস সহিহ হবে''- অর্থাত বুঝা যাচ্ছে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর সময়তেও ভেজাল হাদিসের ব্যাপার সেপার ছিল তাই তিনি ''হাদিস সহিহ'' হওয়ার শর্ত দিয়েছেন।
আমাদেরক মাঝহাব মানতে হবে? কোন মাঝহাব মানব?
আমার আপনার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আমরা সরাসরি এই চার ইমাম তো দুরে থাক ইমামদের পরবর্র্তী ইমামদেরও সরাসরি মানার ক্ষমতা অনেকেই রাখি না। যারা রাখেন তারা ভিন্ন কথা । আমরা আমাদের আশেপাশের আলেম বা হুজুরদের উপর প্রাথমিক ভাবে নির্ভরশীল।
তাই আমাদের কে আলেমদের কথা শুনতে হবে, মানতে হবে। কোনো আলেম যখন আমাদের শিক্ষা দিবেন তখন তিনি আমাদের কননা কোনো ইমামের মতামতকে গ্রহণ করে এবং আমাদের সমস্যার নিমিত্তে নিজের মতামত দিবেন। এবং যেহেতু আমরা কম জানি আলেমরা ভালো জানেন সেহেতু আলেমদের মতামত মানতে হবে।
একইভাবে একজন আলেম আবার কুরান হাদিস বুঝার জন্য অন্যান্য ইমামদের মতামতকে গ্রহণ করেন।
কিন্তু ......
আলেম বলেন আর ইমাম বলেন সবার কথার মূল হতে হবে কুরআন ও সহিহ হাদিস!
অর্থাত যে- ই যেই মতামত দেন না কেন তার ভিত্তি হতে হবে কুরআন ও সহিহ হাদিস।
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) কি কম জানতেন?
তিনি কম জানতেন নাকি বেশি জানতেন সেটার জবাব আমি আপনি দেওয়ার কে? তিনি তো বলেন নাই তিনি যা বলেছেন তা অন্ধভাবে সব মেনে নিতেই হবে। তিনি বরং সতর্ক করে বলেছেন,
''যদি আমি এমন কথা বলি যা আল্লাহর কিবাব ও রাসুলের (সা) হাদীসের পরিপন্থি, তাহলে আমার কথাকে বর্জন করো। (দেওয়ালে ছুড়ে মারো)। (ঈক্কাবুল হিমাম ৫০ পৃষ্ঠা) ''
আমাদের বাড়াবাড়ির দায় তো ইমাম আবু হানিফা (রঃ) গ্রহণ করবেন না!
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হচ্ছে যে,
বর্তমানে যে হানাফি মাঝহাব ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর নামে চালানো হচ্ছে তা যে আদৌ ''ইমাম আবু হানিফার মতামত'' তার কোনো প্রমান নাই। ইমামের নামে মিথ্যা মাঝহাব চালু আছে!
ইমাম কম বুঝেন বা বেশি বুঝেন এ প্রশ্ন রেখে তো সেই কথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যা ইমাম আদৌ বলেছেন তার প্রমান পাওয়া যায় না!
সর্বশেষে লক্ষনীয়, রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
”শেষ যুগে আমার উম্মতের কিছু মানুষ তোমাদেরকে এমন সব হাদিস বলবে যা তোমরা বা তোমাদের পিতা-পিতামহগণ কখনো শুনে নি| খবরদার! তোমরা তাদের থেকে সাবধান থাকবে তাদের থেকে দুরে থাকবে|” (সহিহ মুসলিম)
অতএব সমাজে আজ এমন আলেমদের সৃষ্টি হয়েছে যারা ইমামদের নামে তো মিথ্যা বলছেই এমন কি রাসুল (সাঃ) এর নামে পর্যন্ত জল হাদিস বলে চলেছে! এই হাদীসটিই তারই নির্দেশ করে।
আর সে জন্যই বিচক্ষণ ইমাম আবু হানিফা (রঃ) সতর্কক গিয়েছেন -
যদি আমি এমন কথা বলি যা আল্লাহর কিবাব ও রাসুলের (সা) হাদীসের পরিপন্থি, তাহলে আমার কথাকে বর্জন করো। (দেওয়ালে ছুড়ে মারো)। (ঈক্কাবুল হিমাম ৫০ পৃষ্ঠা)
''যখন হাদীস সহীহ হবে, তখন সেটাই আমার মাযহাব অর্থাৎ হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব। (ইবনুল আবেদীন ১/৬৩; রাসমুল মুফতী ১/৪; ঈক্কামুল মুফতী ৬২ পৃষ্ঠা) ''!!
অতএব জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে আমাদেরকে কারো না কারো মতামতকে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক ।
যে ক্ষেত্রে যে ইমামের মতামত বা যে আলেমের মতামত কুরআন ও সহিহ সুন্নাহের বেশি কাছাকাছি সে সে ক্ষেত্রে সে সে মতামত আমরা গ্রহণ করব ইনশা আল্লাহ।